তাফসীরে নেছারীয়া

By | মে 8, 2017

সূরা ফাতিহা
ফজিলত ও বৈশিষ্ট্য: সূরা আল-ফাতিহা কুরআনের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সূরা। প্রথমত এ সূরা দ্বরাই পবিত্র কুরআন আরম্ভ হয়েছে এবং এ সূরা দ্বারাই সর্বশেষ্ঠ ইবাদত নামাজ আরম্ভ হয়। মুদ্দাস্সিরের কটি আয়াত অবশ্য সূরা আল ফাতিহার পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু পূর্ণঙ্গ সূরা রূপে এ সূরার অবতরণই সর্বপ্রথম। যে সকল সাহাবী (রা.) সূরা আল-ফাতিহা সর্বপ্রথম নাজিল হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন, তাঁদের সে বক্তব্যের অর্থ বোধহয় যে, পরিপূর্ণ সূরারূপে এর আগে আর কোনো সূরা নাজিল হয়নি। এ জন্যই এ সূরার নাম ‘ফাতিহাতুল কিতাব’ বা কুরআনের উপক্রমণিকা রাখা হয়েছে।
সূরাতুল ফাতিহা’ একদিক দিয়ে সমগ্র কুরআনের সার-সংক্ষেপ। এ সূরায় সমগ্র কুরআনের সারমর্ম সংক্ষিপ্তাকারে বলে দেওয়া হয়েছে। কুরআনের অবশিষ্ট সূরাগুলো প্রকারান্তরে সূরাতুল ফাতিহারই বিস্তৃত ব্যাখ্যা। কারণ, সমগ্র কুরআন প্রধানত ঈমান এবং নেক আমলের আলোচনাতেই কেন্দ্রীভূত। আর এ দু’টি মূলনীতিই এ সূরায় সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণনা করা হয়েছে। তাফসীরে রূহুল মা’আনী ও রূহুল বয়ানে এর বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। তাই এ সূরাকে সহীহ হাদীসে উম্মুল কুরআন’ উম্মুল কিতাব’ কুরআনে আযীম বলে ও অবিহিত করা হয়েছে। -(কুরতুবী)
অথবা এ জন্য যে, যে ব্যক্তি কুরআন তেলাওয়াত বা অধ্যায়ন করবে তার জন্য এ মর্মে বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, সে যেন প্রথমে পূর্বপোষিত যাবতীয় ধ্যান-ধারণা অন্তর থেকে দূরীভূত করে একমাত্র সত্য ও সঠিক পথের সন্ধানের উদ্দেশ্যে এ কিতাব তেলাওয়াত আরম্ভ করে এবং আল্লাহর নিকট এ প্রার্থনাও করে যে, তিনি যেন তাকে সিরাতুল-মুস্তাকীমের হিদায়েত দান করেন।
এ সূরার প্রথমেই রয়েছে আল্লাহ তা’আলার প্রশংসা। এর অর্থ হচ্ছে যে, এ প্রশংসার মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে হিদায়েতের দরখাস্ত পেশ করা হলো। আর এ দরখাস্তের প্রত্যুত্তরেই সমগ্র কুরআন, যা الم . ذَلِكَ الْكِتَابُ দ্বারা আরম্ভ হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ আল্লাহর নিকট সঠিক পথের যে সন্ধান চেয়েছে, আল্লাহ পাক তার প্রত্যুত্তরে الم .ذَلِكَ الْكِتَابُ বলে ইশারা করে দিলেন যে, হে আদম সন্তানগণ, তোমরা যা চাও তা এ গ্রন্থেই রয়েছে।
হযরত রাসূলে কারীম (সা.) ইরশদ করেছেন যে, যার হাতে আমার জীবন-মরণ, আমি তাঁর শপথ করে বলছি, সূরা আল-ফাতিহার দৃষ্টান্ত তাওরাত, ইঞ্জিল, যাবূর প্রভৃতি অন্য কোনো আ্সমানী কিতাবে তো নেই-ই, এমনকি পবিত্র কুরআনেও এর দ্বিতীয় নেই। ইমাম তিরমিযী হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, হুযূর (সা.) আরো বলেছেন যে, সূরায়ে ফতিহা প্রত্যেক রোগের ঔষধবিশেষ।
হাদীস শরীফে সূরা আল-ফাতিহাকে সূরায়ে শেফাও বলা হয়েছে।-(কুরতুবী) বুখারী শরীফে হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, সমগ্র কুরআনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূরা হচ্ছে- الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (কুরতুবী)
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
بِسْمِ اللَّهِ কুরআনের একটি আয়াত: সমস্ত মুসলমান এতে একমত যে ِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ কুরআন শরীফের সূরা নামলের একটি আয়াত বা অংশ এবং এ ব্যাপারেও একমত যে, সূরা তাওবা ব্যতীত প্রত্যেক সূরার প্রথমে بِسْمِ اللَّهِ লেখা হয়। بِسْمِ اللَّهِ সূরা আল-ফাতিহার অংশ না অন্যান্য সকল সূরারই অংশ, এতে ইমামগণ ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। ইমাম আবূহানীফা(র.) বলেছেন بِسْمِ اللَّهِ সূরা নামল ব্যতীত অন্যকোনো সূরার অংশ নয়। তবে এটি এমন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আয়াত যা প্রত্যেক সূরার প্রথমে লেখা এবং দু’টি সূরার মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করার জন্য এটি অবতীর্ণহয়েছে।
কুরআন তেলাওয়াত ও প্রত্যেক কাজ বিসমিল্লাহ আরম্ভ করার আদেশ: জাহেলিয়াত যুগে লোকদের অভ্যাস ছিল, তারা তাদের প্রত্যেক কাজ উপাস্য দেব-দেবীদের নামে শুরু করতো। এ প্রথা রহিত করার জন্য হযরত জিবরাঈল (আ.) পবিত্র কুরআনের সর্বপ্রথম যে আয়াত নিয়ে এসেছিলেন, তাতে আল্লাহর নামে কুরআন তেলাওয়াত আরম্ভ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। যথা- اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ
আল্লামা সুয়ূতী (র.) বলেছেন যে, শুধু কুরআনই নয়, বরং অন্যান্য আসমানী কিতাবও বিসমিল্লাহ দ্বারা আরম্ভ করা হয়েছিল। কোনো কোনো আলেম বলেছেন যে, বিসমিল্লাহ পবিত্র কুরআন ও উম্মতে মুহাম্মাদীর বিশেষত্ব। উল্লিখিত দু’টি মতের মীমাংসা হচ্ছে- আল্লাহ তা’আলার নামে আরম্ভ করার আদেশ সকল আসমানী কিতাবের জন্যই বিদ্যমান ছিল। তবে بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ এর শব্দগুলো কুরআনের বিশেষত্ব। যেমন, কোনো কোনো বর্ণনায় দেখা যায়, স্বয়ং রাসূলেকারীম (সা.) ও প্রথমে প্রত্যেক কাজ بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ বলে আরম্ভ করতেন এবং কোনো কিছু লিখাতে হলেও এ কথা প্রথমে লিখাতেন। কিন্ত بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ অবতীর্ণ হওয়ার পর এ বর্ণগুলোকেই গ্রহণ করা হলো এবং সর্বকালের জন্য বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম বলে সব কাজ শুরু করার নিয়ম প্রবর্তিত হলো। -(কুরতুবী, রূহুল মা’আনী)
কুরআন শরীফের স্থানে স্থানে উপদেশ রয়েছে যে, প্রত্যেক কাজ বিসমিল্লাহ বলে আরম্ভ কর। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে, “যেকাজ বিসমিল্লাহ ব্যতীত আরম্ভ করা হয়, তাতে কোনো বরকত থাকে না।”
এক হাদীসে ইরশাদ হয়েছে, ঘরের দরজা বন্ধ করতে বিসমিল্লাহ বলবে, বাতি নেভাতেও বিসমিল্লাহ বলবে, পাত্র আবৃত করতেও বিসমিল্লাহ বলবে। কোনো কিছু খেতে, পানি পান করতে, অজু করতে, সওয়ারিতে আরোহণ করতে এবং তা থেকে অবতরণকালেও বিসমিল্লাহ বলার নির্দেশ কুরআন হাদীসে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। (কুরতুবী)
প্রত্যেক কাজে বিসমিল্লাহ বলার রহস্য: ইসলাম প্রত্যেক কাজ বিসমিল্লাহ বলে শুরু করার নির্দেশ দিয়ে মানুষের গোটা জীবনের গতিই অন্য সকল কিছুর দিক থেকে সরিয়ে নিয়ে একমাত্র আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দিয়েছে। বারবার আল্লাহর নামে কাজ শুরু করার মাধ্যমে সে প্রতি মুহূর্তেই আনুগত্যের এ স্বীকারোক্তি নবায়ন করে যে, আমার অস্তিত্ব ও আমার যাবতীয় কাজ-কর্ম আল্লাহর ইচ্ছা ও সাহায্য ছাড়া হতে পারে না। এ নিয়তের ফলে তার ওঠাবসা, চলাফেরাসহ পার্থিব জীবনের সকল কাজকর্ম ইবাদতে পরিণত হয়ে যায়।
কাজটা কতই না সহজ! এতে সময়ের অপচয় হয় না, পরিশ্রমও হয় না, কিন্তু উপকারিতা একান্তই সুদূরপ্রসারী। এতে দুনিয়াদারির প্রতিটি কাজ দীনের কাজে রূপান্তরিত হয়ে যায়। মুসলমান-অমুসলমান নির্বিশেষে সকলেই পানাহার করে, কিন্তু মুসলমান আহার গ্রহণের পূর্বে বিসমিল্লাহ বলে এ স্বীকারোক্তি জানায় যে, আহার্য বস্তু জমিনে উৎপন্ন হওয়া থেকে শুরু করে পরিপক্ক হওয়া পর্যন্ত তাতে কত পরিশ্রমই না নিয়োজিত হয়েছে। আকাশ-বাতাস গ্রহ-নক্ষত্রের কত অবদানেই না এক-একটি শস্যদানার দেহ পুষ্টি লাভ করেছে। আকাশ-বাতাস গ্রহ-নক্ষত্রের কত অবদানেই না এক-একটি শস্যদানার দেহ পুষ্টি লাভ করেছে। মানুষ, প্রকৃতি এবং উৎপাদনের কাজে নিয়োজিত অন্যান্য জীব-জানোয়ারের যে অবদান খাদ্যের প্রতিটি কণায় বিদ্যমান, তা আমার শ্রম বা চেষ্টা দ্বারা সম্ভবপর ছিল না। একমাত্র আল্লাহ তা’আলাই অনুগ্রহ করে এগুলোকে বিবর্তনের সকল স্তর অতিক্রম করিয়ে উপাদেয় আহার্যরূপে আমাকে দান করেছেন।
মুসলমান-অমুসলমান সকলেই শোয়া, ঘুামায়, আবার জেগে ওঠে। কিন্তু মুমি’ন তার শোয়ার এবং জেগে ওঠার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে আল্লাহর সাথে তার যোগাযোগের সম্পর্ক নবায়ন করে। ফলে তার জাগতিক কাজকর্মও আল্লাহর জিকিরে রূপান্তরিত হয়ে বন্দেগীরূপে লিখিত হয়। একজন মু’মিন কোনো যানবাহনে আরোহন কালে আল্লাহর নাম স্মরণ করে এ কথারই সাক্ষ্য দেয় যে, এ যান বাহনের সৃষ্টি এবং আমার ব্যবহারে এনে দেওয়া ছিল মানবীয় ক্ষমতার উর্ধ্বে। একমাত্র আল্লাহ তা’আলাই সুষ্ঠু এক পরিচালনা পদ্ধতির বদৌলতে কোথাকার কাঠ, কোথায় লোহা, কোথাকার কারিগর, কোথাকার চালক সবকিছু সমবেত করে সবগুলোকে মিলিয়ে আমার খেদমতে নিয়োজিত করেছেন। সামান্য কয়টি পয়সা ব্যয় করে আল্লাহর এতবড় সৃষ্টি আমার নিজের কাজে ব্যবহার করতে পারছি এবং সে পয়সাও আমি নিজে কোনো জায়গা হতে সঙ্গে নিয়ে আসিনি; বরং তা সংগ্রহ করার সকল ব্যবস্থাও তিনিই করে দিয়েছেন। চিন্তা করুন, ইসলামের এ সামান্য শিক্ষা মানুষকে কোথা থেকে কোথায় পৌঁছে দিয়েছে। এ জন্য এরূপ বলা যথার্থ যে, বিসমিল্লাহ এমন এক পরশপাথর যা শুধু তোমাকে নয়, বরং মাটিকেও স্বর্ণে পরিণত করে।
فَلِلَّهِ الْحَمْدُ عَاى دِيْنِ الْاِسْلَامِ وَتَعْلِيْمَاتِه
মাসআলা: কুরআন তেলাওয়াত শুরু করার আগে প্রথমে اَعُوْذُبِا اللهِ مِنَ الشَّيْطنِ الرَّجِيْمِ এবং পরে بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ পাঠ করা সুন্নত। তেলাওয়াতের মধ্যেও সূরা তাওবা ব্যতীত সকল সূরার প্রথমে বিসমিল্লাহ পাঠ করা সুন্নত।
বিসমিল্লাহ-এর তাফসীর: বিসমিল্লাহ বাক্যটি তিনটি শব্দ দ্বারা গঠিত। প্রথমত ‘বা’ বর্ণ দ্বিতীয়ত ‘ইসম’ ও তৃতীয়ত ‘আল্লাহ’। আরবি ভাষায় ‘বা’ বর্নটি অনেক অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তন্মধ্যে তিনটি অর্থ এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে এবং এ তিনটির যে কোনো একটি অর্থ এ ক্ষেত্রে গ্রহণ করা যেতে পারে। (১) সংযোজন। অর্থাৎ এক বস্তুকে অপর বস্তুর সাথে মিলানো বা সংযোগ ঘটানো অর্থে। (২) ইস্তিয়ানাত অর্থাৎ কোনো বস্তুর সাহায্য নেওয়া। (৩) কোনো বস্তু থেকে বরকত হাসিল করা।
ইসম শব্দের ব্যাখ্যা অত্যন্ত ব্যপক। মোটামুটিভাবে এতটুকু জেনে রাখা যথেষ্ট যে, ‘ইসম’ নামকে বলা হয়। ‘আল্লাহ’ শব্দ সৃষ্টিকর্তার নামসমূহের মধ্যে সবচেয়ে মহত্ত্বর ও তার যাবতীয় গুণের সম্মিলিত রূপ। কোনো কোনো আলেম একে ইসমে আ’যম বলেও অভিহিত করেছেন।
এ নামটি আল্লাহ ব্যতীত অন্যকারো জন্য প্রযোজ্য নয়। এ জন্যই এ শব্দটির দ্বিবচন বা বহুবচন হয় না। কেননা, আল্লাহ এক; তাঁর কোনো শরিক নেই। মোটকথা, আল্লাহ এমন এক সত্তার নাম, যে সত্তা পালনকর্তার সমস্ত গুণের এক অসাধারণ প্রকাশবাচক। তিনি অদ্বিতীয় ও নজিরবিহীন। এ জন্য বিসমিল্লাহ শব্দের মধ্যে ‘বা’ এর তিনটি অর্থের সামঞ্জস্য হচ্ছে আল্লাহর নামের সাথে, তাঁর নামের সাহায্যে এবং তার নামের বরকতে।
কিন্তু তিন অবস্থাতেই যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁর নামের সাথে, তাঁর নামের সাহায্যে এবং তাঁর নামের বরকতে, যে কাজ করা উদেশ্য তা উল্লেখ করা না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত বাক্যটি অসম্পূর্ণ থাকে। এজন্য ‘ইলমে নাহু’র (আরবি ব্যকরণশাস্ত্র) নিয়মানুযায়ী স্থান-উপযোগী ক্রিয়া উহ্য ধরে নিতে হয়। যথা আল্লাহর নামে আরম্ভ করছি বা পড়ছি। এ ক্রিয়াটিকে উহ্যই ধরতে হবে, যাতে ‘আরম্ভ আল্লাহর নামে কথাটি প্রকাশিত হয়। সে উহ্য বিষয়টিও আল্লাহ নামের পূর্বে হবে না। আরবি ভাষার নিয়মানুযায়ী শুধু ‘বা’ বর্ণটি আল্লাহর নামের পূর্বে ব্যবহৃত হয়েছে। এ ব্যাপারে মাসহাফে-উসমানীতে সাহাবীগণের সম্মিলিত অভিমত উদ্ধৃত করে মন্তব্য করা হয়েছে যে, ‘বা’ বর্ণটি ‘আলিফ’ এর সঙ্গে মিলিয়ে এবং ‘ইসম’ শব্দটি পৃথকভাবে লেখা উচিত ছিল। এমতাবস্থায় শব্দের রূপ بِسْمِ اللَّهِ কিন্তু মাসহাফে উসমানীর লিখন পদ্ধতিতে ‘হামযা’ বর্ণটি উহ্য রেখে ‘বা’-কে ‘বীন’- এর সাথে যুক্ত করে লিখে ‘বা’-কে ইসমের অংশ করে দেওয়া হয়েছে, যাতে আরম্ভটা আল্লাহর নামেই হয়। একই কারণে অন্যত্র আলিফকে উহ্য রাখা হয় না। যথা اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ এতে ‘বা’ কে আলিফের’ সাথে লেখা হয়েছে। মোটকথা, বিসমিল্লাহর বেলায় বিশেষ এক পদ্ধতি অনুসরণ করে ‘বা’ বর্ণকে ‘ইসম’ এর সঙ্গে মিলিত করে লেখার নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে। الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ রাহমান ও রাহীম উভয়ই আল্লাহর গুণবাচক নাম। রহমান অর্থ সাধারণ ও ব্যপক রহমত এবং রাহীম অর্থ পরিপূর্ণ ও বিশেষ রহমত।
সাধারণ রহমতের অর্থ হচ্ছে যে, এ রহমত বা দয়া সমগ্র জাহানে যা সৃষ্টি হয়েছে এবং ভবিষ্যতে যা সৃষ্টি হবে, সে সকলের জন্যই সমভাবে প্রযোজ্য। পরিপূর্ণ রহমত অর্থ হচ্ছে যে, তা সম্পূর্ণ বা পূর্ণঙ্গ। আর এ জন্যই ‘রাহমান’ শব্দ আল্লাহ তা’আলার ‘যাতের’ জন্য নির্দিষ্ট। কোনো সৃষ্টিকে রাহমান বলা চলে না। কারণ, আল্লাহ ব্যতীত এমন কোনো সত্তা নেই, যার রহমত বা দয়া সমস্ত বিশ্ব-চরাচরে সমভাবে বিস্তৃত হতে পারে। এ জন্য আল্লাহ শব্দের ন্যায় রহমান শব্দের ও দ্বিবচন বা বহুবচন হয় না। কেননা, এ শব্দটি একক সত্তার সাথে সংযুক্ত বা একক সত্তার জন্য নির্দিষ্ট। তাই এখানে দ্বিতীয় বা তৃতীয় করো উপস্থিতির সম্ভাবনা নেই। (কুরতুবী)
‘রাহীম’ শব্দের অর্থ ‘রাহমান’ শব্দের অর্থ থেকে স্বতন্ত্র। কারণ, কোনো ব্যক্তির পক্ষে অন্য ব্যক্তির প্রতি দয়া প্রদর্শন করা সম্ভব, সুতরাং সে দয়া বা রহমত এ শব্দে প্রযোজ্য হওয়া অসম্ভব নয়। এ জন্য ‘রাহীম’ শব্দ মানুষের জন্যও বলা যোতে পারে। আল-কুরআনে রাসূল (সা.) এর জন্যও এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। বলা হয়েছে بِالْمُؤْمِنِنْنَ رَؤُفٌ رَّحِيْمٌ
মাসআলা: আজকাল ‘আব্দুর রহমান’, ‘ফজলুর রহমান’ পৃভৃতি নাম সংক্ষেপ করে শুধু ‘রহমান’ বলা হয়েথাকে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ‘রহমান’ বলে ডাকা হয়। এরূপ সংক্ষেপ করা জায়েজ নয়: পাপের কাজ।
জ্ঞাতব্য: বিসমিল্লাহতে আল্লাহ তা’আলার সুন্দর নাম ও পূর্ণঙ্গ ও গুণাবলির মধ্যে মাত্র দু’টি গুণের উল্লেখ করা হয়েছে। শব্দ দু’টিই ‘রহমত’ শব্দ হতে গঠিত হয়েছে, যা রহমতের ব্যপকতার প্রতি ইশারা করে। এতে একথাও বুঝনো হয়েছে যে, এ বিশ্ব-চরাচর, আকাশ, বাতাস, সৃষ্টিরাজি পয়দা করা, এ সবের রক্ষণাবেক্ষণ ও লালনপালনের দায়িত্ব গ্রহণ করাও আল্লাহ তা’আলার গুণাবলিতে সংযুক্ত। কোনো বস্তুকেই তিনি স্বীয় প্রয়োজনে বা অন্য কারো প্ররোচনায় বা অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সৃষ্টি করেননি; বরং তাঁর রহমত বা দয়ার তাকিদেই সৃষ্টি করে এর রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রতিপালনের ব্যবস্থা করেছেন।
‘তা‘আব্বুয’ শব্দের অর্থ- اَعُوْذُبِا اللهِ مِنَ الشَّيْطنِ الرَّجِيْمِ পাঠ করা। আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে যখন কুরআন পাঠ কর, তখন শয়তানের প্রতারণা হতে আল্লাহ তা’আলার নিকট আশ্রয় চাও। দ্বিতীয়ত, কুরআন পাঠের প্রাক্কালে আ‘ঊযুবিল্লাহ্ পাঠ করা ইজমায়ে-উম্মত দ্বারা সুন্নত বলে স্বীকৃত হয়েছে। এ পাঠ নামাজের মধ্যেই হোক বা নামাজের বাইরেই হোক। কুরআন তেলাওয়াত ব্যতীত অন্যান্য কাজে শুধু বিসমিল্লাহ পাঠ করা সুন্নত, আঊযুবিল্লাহ নয়। যখন কুরআন তেলাওয়াত আরম্ভ করা হয় তখন আঊযুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ উভয়টিই পাঠ করা সুন্নত। তেলাওয়াত কালে একটি সূরা শেষ করে অপর সূরা আরম্ভ করার পূর্বে শুধুমাত্র সূরা তাওবা ব্যতীত অন্য সকল সূরা তেলাওয়াতের পূর্বে বিসমিল্লাহ পাঠ করতে হয়। তেলাওয়াত করার সময় মধ্যে সূরা-বারাআত এলে তখন বিসমিল্লাহ পড়া নিষেধ। কিন্তু প্রথমে তেলাওয়াতই যদি সূরা বারাআত দ্বারা আরম্ভ হয়, তবে আ‘ঊযুবিল্লহ, ও বিসমিল্লাহ্ উভয়টিই পাঠ করতে হবে। (আলমগীরী)
‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’, কুরআনের সূরা নামল এর একটি আয়াতের অংশ এবং দু’টি সূরার মাঝখানে একটি পূর্ণঙ্গ আয়াত। তাই অন্যান্য আয়াতের ন্যায় এ আয়াতটির সম্মান করাও ওয়াজিব। অজু ছাড়া তাকে স্পর্শ করা জায়েজ নয়। অপবিত্র অবস্থায় যথা হায়েয-নেফাসের সময় (পবিত্র হওয়ার পূর্বে) তেলাওয়াতরূপে পাঠ করাও নাজায়েজ। তবে কোনো কাজকর্ম আরম্ভ করার পূর্বে (যথা পানাহার) দোয়াস্বরূপ পাঠ করা সব সময়ই যায়েজ।
মাসআলা: নামাজের প্রথম রাকআত আরম্ভ করার সময় আ‘ঊযুবিল্লাহ-এর পরে বিসমিল্লাহ পাঠ করা সুন্নত। তবে আস্তে পাঠ করবে, না সরবে পাঠ করতেব, এতে ভিন্ন ভিন্ন মত দেখা যায়। ইমাম আবু হানীফা(র.) ও তাঁর অনুসারী ইমামগণ নীরবে পাঠ করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। নামাজের প্রথম রাকআতের পর অন্যান্য রাকআতে বিসমিল্লাহ পাঠ করা সুন্নত বেল সকলে একমত হয়েছেন। কোনো কোনো রিওয়ায়াতে প্রত্যেক রাকআতের শুরুতে বিসমিল্লাহ পড়াকে ওয়াজিব বলা হয়েছে। (শরহে-মানিয়্যাহ)
মাসআলা: নামাজে সূরা-ফাতিহা পাঠ করার পর অন্য সূরা পাঠ করার পূর্বে বিসমিল্লাহ পাঠ না করা উচিত। নবী করীম (সা.) এবং খুলাফায়ে রাশেদীন থেকেই এটা পাঠ করার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ‘শরহে-মানিয়্যাহতে একে ইমাম আবূ হানীফা (র.) ও ইমাম আবূ ইউসূফ (র.) এর অভিমত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শরহে-মানিয়্যাহ, দুররে-মুখতার, বুরহান প্রভৃতি কিতাবে এ অভি মতকেই গ্রহণযোগ্য বলে মত প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু ইমাম মুহাম্মাদ (র.) বলেছেন, যেসব নামাজে নীরবে কিরাআত পড়া হয়, সেসব নামাজে বিসমিল্লাহ পড়া উত্তম। আবার কোনো কোনো বর্ণনাতে এটা ইমাম আবূ হানীফা (র.) এর মত বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। শামী কোনো কোনো ফিকহ্শাস্ত্রবিদের মতামত বর্ণনা করে এ মতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তবে এতেও সকলেই একমত হয়েছেন, যে যদি কেউ তা পাঠ করে তবে তাতেও কোনো দোষের কারণ নেই।
মুসলিম শরীফে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, যে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন নামাজ (অর্থাৎ সূরাতুল-ফাতিহা) আমার এবং আমার বান্দাদেরমধ্যে দু’ভাগে বিভক্ত, অর্ধেক আমার জন্য আর অর্ধেক আমার বান্দাদের জন্য। আমার বান্দাগণ যা চায়, তা তাদেরকে দেওয়া হবে। অথঃপর রাসূল (স.) বলেছেন যে, যখন বান্দাগণ বলে الْحَمْدُ لِلَّهِ তখন আল্লাহ বলেন যে, আমার বান্দাগণ আমার প্রশংসা করছে। আর যখন বলে الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ তখন তিনি বলেন যে, তারা আমার মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করছে। আর যখন বলে مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ তখন তিনি বলেন যে তারা আমার বান্দাগণ আমার গুণগান করছে। আর যখন বলে إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ তখন তিনি বলেন যে, এ আয়াতটি আমি এবং আমার বান্দাগণের মধ্যে সংযুক্ত। কেননা, এর এক অংশে আমার প্রশংসা এবং অপর অংশে বান্দাগণের দোয়া ও আরজ রয়েছে। এ সঙ্গে এ কথাও বলা হয়েছে যে, বান্দাগণ যা চাইবে তারা তা পাবে।
অতঃপর বান্দাগণ যখন বলে اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ (শেষ পর্যন্ত) তখন আল্লাহ বলেন, এসবই আমার বান্দাগণের জন্য এবং তারা যা চাইবে তা পাবে। (মাযহারী)
الْحَمْدُ لِلَّهِ সকল প্রশংসা আল্লাহ তা’আলার। অর্থাৎ দুনিয়াতে যে কোনো স্থান যে কোনো বস্তুর প্রশংসা করা হয়, বাস্তবে তা আল্লাহরই প্রশংসা। কেননা, এ বিশ্ব চরাচারে অসংখ্য মনোরম দৃশ্যাবলি, অসংখ্য মনোমুগ্ধকর সৃষ্টিরাজি আর মীমাহীন উপরকারী সবস্তুসমূহ সর্বদাই মানব মনকে আল্লাহ তা’আলার প্রতি আকৃষ্ট করতে থাকে এবং তাঁর প্রশংসায় উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। একটু ঘভীরভাবে চিন্তা করলেই বুঝা যায় যে, সকল বস্তুর অন্তরালেই এক অর্দশ্য সত্তার নিপুণ হাত সদা সক্রিয় রয়েছে।
যখন পৃথিবীর কোথোও কোনোবস্তুর প্রশংসা করা হয়, তখন প্রকৃতপক্ষে সে প্রশংসা প্রস্তুতকারকেরই করা হয়। এ বাক্যটি প্রকৃত পক্ষে মানুষের সামনে বাস্তবতার একটি নতুন দ্বার উন্মুক্ত করে দেখিয়েছে যে, আমাদের সামনে যা কিছু রয়েছে এসব কিছুই একটি একক সত্তার সাথে জড়িত এবং সকল প্রশংসাই সে অনন্ত অসীম শক্তির। এসব দেখে কারো অন্তরে যদি প্রশংসা-বাণীর উদ্রেক হয় এবং মনে করে যে, তা অন্য কারো প্রাপ্য, তবে এ ধারণা জ্ঞাণ-বুদ্ধির সংকীর্ণতারই পরিচায়ক। সুতরাং নিঃসন্দেহে একথাই বলেতে হয় যে, الْحَمْدُ لِلَّهِ যদিও প্রশংসার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু এর মধ্যে অতি সূক্ষ্মতার সাথে বর্ণনা করা হয়েছে যে, সকল সৃষ্ট বস্তুর উপাসনা রহিত করা হলো। তা ছাড়া এর দ্বারা অত্যন্ত আকর্ষণীয় পদ্ধতিতে একত্ববাদের শিক্ষাও দেওয়া হয়েছে। আল-কুরআনের এ ক্ষুদ্র বাক্যটিতে একদিকে আল্লাহ তা’আলার প্রশংসা করা হয়েছে এবং অপরদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য়ে নিমগ্ন মানব মনকে এক অতিবাস্তবের দিকে আকৃষ্ট করত যাবতীয়সৃষ্ট বস্তুর পূজা-আর্চনাকে চিরতরে রহিত করা হয়েছে। এতদসঙ্গে অতি হেকমতের সাথে বা অকাট্য বাবে ঈমানের সর্বপ্রথম স্তম্ভ ‘তাওহীদ’ বা একত্বাবাদের পরিপূর্ণ নকলাও তুলে ধরা হয়েছে। একটু চিন্তা করলে বোঝাযায় যে, বাক্যটিতে যে দাবি করা হয়েছে, সে দাবির স্বপক্ষে দলিলও দেওয়া হয়েছে।
فَتَبَا رَكَ اللهُ اَحْسَنُ الْخَا لِقِيْنَ
رَبِّ الْعَالَمِينَ এ ক্ষুদ্র বাক্যটির পরেই আল্লাহ্ তা’আলার প্রথম গুণবাচক নাম ‘রাব্বুল আলামীন’- এর উল্লেখ করাহ য়েছে। সংক্ষিপ্তভাবে এর তাফসীর লক্ষণীয়। আরবি ভাষায় رَبٌّ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে পালনকর্তা। লালনপালন বলতে বুঝায় اِبْلاَغُ الشَّىْءِ الى حد الكمال شيئافشيئا با لتربية কোনো বস্তুকে তার সমস্ত মঙ্গলামঙ্গলের প্রতি লক্ষ্য রেখে ধীরে ধীরে বা পর্যায়ক্রমে সামনে অগ্রসর করে উন্নতির চরম শিখরে পৌছে দেওয়া।
এ শব্দটি একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। সম্বন্ধপদ রূপে অন্যের জন্যেও ব্যবহার করা চলে, সাধারণভাবে নয়। কেননা, প্রত্যেকটি প্রাণী বা সৃষ্টিই প্রতিপালিত হওয়ার মুখাপেক্ষী, তাই সে অন্যের প্রকৃত প্রতিপালনের দায়িত্ব নিতে পারে না।
الْعَالَمِينَ শব্দটি عالم শব্দের বহুবহচন। এতে পৃথিবীর যাবতীয় সৃষ্টিই অন্তর্ভুক্ত। যথা- আকাশ-বাতাস, চন্দ্র-সূর্য, তারা-নক্ষত্ররাজি, বিজলী, বৃষ্টি, ফেরেশতাকুল, জিন, জমিন এবং এতে যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে। জীবজন্তু, মানুষ, উদ্ভিদ, জড়পদার্থ সব কিছুই এ অন্তর্ভূক্ত। অতএব الْعَالَمِينَ এর অর্থহচ্ছে- আল্লাহ তা’আলা সমস্ত সৃষ্টির পালনকর্তা। তা ছাড়া একথাও চিন্তার উর্ধ্বে নয় যে, আমরা যে দুনিয়াতে বসবাস করছি রে মধ্যেও কোটি কোটি সৃষ্টবস্তু রয়েছে। এ সৃষ্টিগুলোর মধ্যে যা কিছু আমাদের দৃষ্টিগোচন হয় এবং যা আমরা দেখি না সে সবগুলোই এক একটা আলম বা জগত।
তাছাড়া আরো কোটি কোটি সৃষ্টি রয়েছে, যা সৌরজগতের বাইরে, যা আমরা অবলোকন করতে পারি না। ইমাম রাযী তাফসীরে-কাবীরে লিখেছেন যে, এ সৌরজগতের বাইরে, যা আমরা অবলোকন করতে পারি না। ইমাম রাযী তাফসীরে লিখেছেন যে, এ সৌরজগতের বাইরে আরো সীমাহীন জগত রয়েছে। যুক্তি দ্বারা প্রমাণিত এবং একথা সর্বজন বিদিত যে, সকল বস্তুই আল্লাহর ক্ষমতার অধীন। সুতরাং তাঁর জন্য সৌরজগতের অনুরূপ আরো সীমাহীন কতগুলো জগত সৃষ্টি করে রাখা অসম্ভব মোটেই নয়।
হযরত আবূসা‘ঈদ খুদরী (রা.) বলেছেন যে, চল্লিশ হাজার জগৎ রয়েছে। আর এ পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম ও উত্তর দক্ষিণ পর্যন্ত একটি জগৎ। বাকিগুলোর প্রত্যেকটিও অনুরূপ। হযরত মাকাতিল (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, জগতের সংখ্যা ৮০ হাজার। (কুরতুবী) এতে সন্দেহ করা হয় যে, মহাশূন্যে বায়ূ না থাকায় মানুষ বা কোন প্রাণীর বাস করার উপযোগী নয় বলে কোনো প্রাণী সেখানে জীবিত থাকতে পারে না। ইমাম রাযী (র.) এর উত্তরে বলেছেন যে এটা এমন কোনো জরুরি ব্যপার নয় যে, এই জগতের অধিবাসীদের মতোই হতে হবে, যে জন্য তারা মহাশূন্যে জীবিত থাকতে পারবে না; বরং এরকমই বা হবে না কেন যে, সেসব জগতের অধিবাসীদের অভ্যাস ও প্রকৃতি এই জগতের অধিবাসীদের অভ্যাস ও প্রকৃতি হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন?
আজ থেকে প্রায় সাতশ সত্তর বছর আগে যখন মাহাশূন্যে ভ্রমণের উপকরণও আবিস্কৃত হয়নি, সে যুগেই মুসলিম দার্শনিক ইমাম রাযী (র.) এসব তথ্য লিখেছেন। আজকাল রকেট প্রভৃতি বৈজ্ঞানিক যানের যুগে মহাশূন্য ভ্রমণকারীরা যা কিছু বলেন, তা ইমাম রাযীর (র.) বর্ণনার চেয়ে বেশি কিছু নয়।
এ জগতের বাইরে মাহাশূন্যের কোনো সীমা-পরিসীমা মানুষের জানা নেই। অতএব, নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন যে, সীমাহীন মহাশূন্যে আর কত সৃষ্টি রয়েছে এই দুনিয়ার নিকটমত গ্রহ-উপগ্রহ চন্দ্র ইত্যদির বাসিন্দা সম্পর্কে বর্তমান যুগের বিজ্ঞ-বিজ্ঞাণীরা অনুমান করেন, তাও তো এই যে, এ সমস্ত গ্রহ-উপগ্রহে যদি কোনো প্রাণী-জগতের অস্তিত্ব থেকেও থাকে, তবে তাদের স্বভাব-চরিত্র এ দুনিয়ার বাসিন্দাদের অনুরূপ হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। বরং গ্রহনযোগ্য যুক্তি হচ্ছে- তাদের স্বভাব-চরিত্র, আদত-অভ্যাস, আহার্য ও প্রয়োজন এখঅনকার বাসিন্দাগণ হতে সম্পূর্ণ পৃথক ও ভিন্ন হবে। এ জন্য একটিকে অপরটির উপর কিয়াস করার কোনো কারণ থাকতে পারে না। ইমাম রাযী (র.) এর উক্তির সমর্থনে, আমেরিকার মহাশূন্য ভ্রমণকারী জনৈক বিজ্ঞাণী আকাশ ভ্রমন হতে প্রত্যাবর্তন করে মাহাশূন্য সম্পর্কে কিছুটা অনুমান ব্যক্ত করেছেন এবং বলেছেন যে, মহাশূন্যের সীমারেখা সম্পর্কে কোনো কিছুই বলারর উপায় নেই। মাহাশূন্যের আয়ন ও সীমারেখা কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত, তা অনুমান করাও কঠিন ব্যাপার।
আল-কুরআনের এ ছেঅট বাক্যটির প্রতি গভীরভাবে লক্ষ্য করলে বুঝা যায় যে, আল্লাহ তা’আলা তাঁর সৃষ্টিজগতের লালনপালন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কত সুদৃড় ও কত অচিন্তনীয় ব্যবস্থা করে রেখেছেন! আকাশ থেকে পাতাল পর্যন্ত এবং গ্রহ থেকে ক্ষুদ্র ধূলিকণা পর্যন্ত এই ব্যবস্থাপনার আওতাভুক্ত এবং একজন অতি প্রাজ্ঞ পরিচালকের অধীনে প্রতিটি সৃষ্ট বস্তুই নিজ নিজ কর্তব্যে নিয়োজিত। মানুষেল সামান্য খাদ্য, যা সে তার মুখে দেয় তাতে চিন্তা করলেনই বুঝা যায় যে, এর উৎপাদনের জন্য আকাশ ও জমিনের সমস্ত শক্তি এবং কোটি কোটি মানুষ ও জীব-জন্তুর পরিশ্রম তাতে শামিল রয়েছে। সমগ্র জগতের শক্তি এই এক লোকমা খাদ্য প্রস্তুতে এমনিভাবে ব্যস্ত যে, মানুষ এ বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করেই তা দ্বারা যেন পরম জ্ঞাণ লাভ করতে সক্ষম হয়! সে যেন অনুধাবন করতে পারে যে, আল্লাহ তা’আলা আকাশ ও জমিনের সকল সৃষ্টিকে মানবের উপকারের জন্য নিয়োজিত রেখেছেন। যার সেবায় এত কিছু নিয়োজিত, তার জন্ম অনর্থক নয়; বরং তারও কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য অবশ্যই রয়েছে।
আল-কুরআনের এ আয়াতটিতে মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও মানব জীবনের মকসুদ বা লক্ষ্য বর্ণনা করা হয়েছেÑ وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ অর্থাৎ জিন ও মানুষকে একমাত্র আমার ইবাদতের জন্যেই সৃষ্টি করেছি, অন্য কোনো কাজের জন্য নয়।
উপরিউক্ত আলোচনা দ্বারা পরিস্কারভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, رَبِّ الْعَالَمِينَ এর নিখুঁত প্রতিপালন নীতিই পূর্বের বাক্য الْحَمْدُ لِلَّهِ এর দলিল বা প্রমাণ। সমগ্র সৃষ্টির লালনপালনের দায়িত্ব একই পবিত্র সত্তার; তাই তারিফ-প্রসংসারও প্রকৃত প্রাপক তিনিই; অন্য কেউ নয়। এ জন্য প্রথম আয়াত الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ এর তারীফ-প্রশংসার সাথে ঈমানের প্রথম স্তম্ভ আল্লাহ তা’আলার একত্ব বা তাওহীদের কথা অতি সূক্ষ্মভাবে এসেছে।
দ্বিতীয় আয়াতে তাঁর গুণ, দয়ার প্রসঙ্গ الرَّحْمَنِ ও الرَّحِيمِ শব্দদ্বয়ের দ্বারা বর্ণনা করেছেন। উভয় শব্দই গুণের আধিক্যবোধক বিশেষ্য’ যাতে আল্লাহর দয়ার অসাধারণত্ব ও পূর্ণতার কথা বুঝায়। এ স্থলে এ গুণের উল্লেখ সম্ভবত এ জন্য যে, আল্লাহ তা’আলা যে সমগ্র সৃষ্টিজগতের লালনপালন, ভরণপোষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং গ্রহণ করেছেণ এতে তাঁর নিজস্ব কোনো প্রয়োজন নেই বা অন্যের দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়েও নয়; বরং তাঁর রহমত বা দয়ার তাকিদেই তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। যদি সমগ্র সৃষ্টির অস্তিত্বও না থাকে, তাতেও তাঁর কোনো লাভ-ক্ষীত নেই। আর যদি সমগ্র সৃষিট অবাধ্যও হয়ে যায় তবে তাতেও তাঁর কোনো ক্ষতি-বৃদ্ধি নেই।
مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ: مَالِكِ শব্দ مَالِكِ ধাতু হতে গঠিত। এর অর্থ কোনো বস্তুর উপর এমন অধিকার থাকা, যাকে ব্যবহার, রদবদল, পরিবর্তন, পরিভর্ধন সব কিছু করার সকল অধিকার থাকবে। دينঅর্থ প্রতিদান দেওয়া। مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ এর শাব্দিক অর্থ- প্রতিদান-দিবসের মালিক বা অধিপতি। অর্থাৎ প্রতিদান-দিবসের অধিকার ও আধিপত্য কোন বস্তুর উপরে হবে, তার কোনো বর্ণনা দেওয়া হয়নি। তাফসীরে কাশশাফে বলা হয়েছে যে, এতে ‘আম’ বা অর্থের ব্যপকতার প্রতি ইশারা করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদান দিবসে সকল সৃষ্টিরাজি ও সকল বিষয়ই আল্লাহ তা’আলার অধিকারে থাকবে। (কাশ্শাফ)
প্রতিদান দিবসের স্বরূপ ওতার প্রয়োজনীয়তা: প্রথমত প্রতিদান দিবস কাকে বলে এবং এর স্বরূপ কি? দ্বিতীয়ত সমগ্র সৃষ্টিরাজির উপর প্রতিদান দিবসে যেমনিভাবে আল্লাহ তা’আলার একক অধিকার থাকবে অনুরূপভাবে আজও সকল কিছুর উপর তাঁরই তো একক অধিকার রয়েছে; সুতরাং প্রতিদান দিবসের বৈশিষ্ট্য কোথায়?
প্রথম প্রশ্নের উত্তর হচ্ছেÑ ‘প্রতিদান-দিবস’ সে দিনকেই বলা হয়, যেদিন আল্লাহ তা’আলা ভালমন্দ সকল কাজকর্মের প্রতিদান দেবেন বলে ঘোষণা করেছেন। ‘রোযে-জাযা’ শব্দ দ্বারা বুঝানো হয়েছে, দুনিয়া ভালমন্দ
কাজকর্মের প্রকৃত ফলাফল পাওয়ার স্থান নয়; বরং ইহা কর্মস্থল, কর্তব্য ও দায়িত্ব পালনের জায়গা। যথার্থ প্রতিদান বা পুরস্কার গ্রহণেরও স্থান এটা নয়। এতে একথাও বুঝা যাচ্ছে যে, পৃথিবীতে কারও অর্থ-সম্পদ ও সুখÑশন্তির ব্যপকতা দেখে বলা যাবে না যে, এ লোক আল্লাহর দরবারে মকবুল হয়েছেন বা তিনি আল্লাহর প্রিয়পাত্র। অপরপক্ষে কাউকে বিপদাপদে পতিত দেখেও বলা যাবে না যে, তিনি আল্লাহর অীভশপ্ত।
যমনি করে কর্মস্থলে বা কারানার কোনো কোনো লোককে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে ব্যস্ত দেখে কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি তাকে বিদগ্রস্ত বলতে পারে না এবং সে নিজেও দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত বলে নিজেকে বিপদগ্রস্ত বলে ভাবে না; বরং সে এ ব্যস্ততা থেকে রেহাই দিতে চায়, তবে তাকে সে সবচেয়ে বড় ক্ষতি বলে মনে করে। সে তার এ ত্রিশ দিনের পরিশ্রমের অন্তরালে এমন এক আরাম দেখতে পায়, য তার বেতনস্বরূপ সে লাভ করে।
এ জন্যই নবীগণ এ দুনিয়ার জবিনে সর্বাপেক্ষা বেশি বপদাপদে পড়েছেন এবং তারপর ওলী-আওলিয়াগণ সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন। কি ন্তু দেখা গেছে, বিপদের তীব্রতা যত কঠিনই হোকানা কেন, দৃঢ়পদে তাঁরা তা সহ্য করেছেন। এমনকি আনন্দিত চিত্তেই তাঁরা তা মেনে নিয়েছেন। মোটকথা, দুনিয়ার আরম-আয়েশকে সত্যবাদিতা ও সঠিকতা এবং বিপদাপদকে খারাপ কাজের নিদর্শন বলা যায় না।
অবশ্য কখনো কোনো কর্মের সামান্য ফলাফল দুনিয়াতও প্রকাশ করা হয় বটে, তবে তা সেকাজের পূর্ণ বদল হতে পারে না। এগুলো সাময়িকভাবে সতর্ক করার জন্য একটু নিদর্শন মাত্র। এ প্রসঙ্গে আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে وَلَنُذِيقَنَّهُمْ مِنَ الْعَذَابِ الْأَدْنَى دُونَ الْعَذَابِ الْأَكْبَرِ অর্থাৎ এবং আমরা মানুষকে (পরকালের বড় শাস্তির) আগেই দুনিয়াতে কিছু শাস্তি দিয়েথাকি, যেন তারা মন্দ কাজ থেকে ফিরে আসে। (সূলা সাজদাহ-২১) অন্যত্র এরশাদ হয়েছে- كَذَلِكَ الْعَذَابُ وَلَعَذَابُ الْآخِرَةِ أَكْبَرُ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ অর্থাৎ এরূপ শস্তি হয়ে থাকেএবং পরকালের শাস্তি আরো বড়, যদি তা তারা বুঝে। (সূরা কলম-৩৩)
মোটকথা দুনয়ার আরাম আয়েশ এবং বিপদাপদ কোনো কোনো সময় পরক্ষিাস্বরূপও হয়ে থাকে, আবার কোনো কোনো সময় সতর্কীকরণের জন্যও শাস্তিরূপে প্রবর্তিত হয়।
কিন্তু তা কর্মের পূর্ণ ফলাফল নয়, সামান্য নমুনা মাত্র। কেননা, এ সব কিছুই ক্ষণিকের এবং ক্ষণস্থায়ী। চিরস্থঅয়ী বা দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও শস্তি হবে পরকালে। যেদিন সে শান্তি অথবা শাস্তি দেওয়া হবে, সেদিনের নামই প্রতিদান দিবস। যখন বুঝা গেল যে, ভালও মন্দ কাজের পরিপূর্ণ প্রতিদানের স্থন এ পৃথিবী নয়, তখন বিচার-বুদ্ধিও যুক্তির কথা হচ্ছে এই যে, ভাল ও মন্দ যেন একই পর্যায়ভুক্ত হয়ে না যায়, সে জন্য প্রত্যেক কাজের প্রতিদান অবশ্যই পাওয়া উতি।এজন্যই এজগৎ ব্যতীত একটি ভিন্ন জগতের প্রয়োজন। যেখানে ছোট-বড়ক, ভাল-মন্দ সকল কাজের প্রতিদান ন্যায়-নীতির ভিত্তিতে দেওয়া হবে। কুরআনের ভাষায় তাকেই ‘প্রতিদান দিবস’ কিয়ামত বা পরকাল বলাহয়।
সূরা আল-মু’মিনের আল্লাহ্ তা’আলা এ বিষয়ে বিশদ বর্ণনা দিয়েছেনÑ
وَمَا يَسْتَوِي الْأَعْمَى وَالْبَصِيرُ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَلَا الْمُسِيءُ قَلِيلًا مَا تَتَذَكَّرُونَ- إِنَّ السَّاعَةَ لَآتِيَةٌ لَا رَيْبَ فِيهَا وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يُؤْمِنُونَ.
অথাৎ অন্ধ এবং দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তি যেমন এক পর্যায়ের নয়, তেমনি যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করে, আর যারা মন্দ কাজ করে তারা পরস্পর সমান নয়। তোমরা অত্যন্ত কম বুঝ। কিয়ামত অবশ্যই হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা বিশ্বাস করে না। (সূরা-গাফির: ৫৮-৫৯)
মালিক কে? مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ বাক্যটিতে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে- বুদ্ধিমান ব্যক্তি মাত্রই একথা জানেন যে, সেই সত্তাই প্রকৃত মালিক, যিনি সমগ্র সৃষ্টি জগতকে সৃষ্টি করেছেন এবংএর লালনপালন ও বর্ধনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং যাঁর মলিকানা পূর্ণরূপে প্রত্যেক বস্তুর মধ্যেই সর্বাবস্থায় পরিব্যাপ্ত। অর্থাৎ, প্রকাশ্যে, গোপনে, জীবিতাবস্থায় ও মৃতাবস্থায় তিনিই একমাত্র মালিক এবং যার মালিকানার আরম্ভ নেই, শেষও নেই। এ মালিকানার কোনো তুলনা চলে না। কেননা, মানুষেল মালিকানা আরম্ভ ও শেষেল চৌহদ্দিতে সমিাবদ্ধ। এক সময় তা চলে না, কিছুদিন পরেই তা থাকবে না। অপর দিকে মানুষের মালিকানা হস্তারন্তরযোগ্য। বস্তুর বাহ্যিক দিকের উপরই তা বর্তঅয়, গোপনীয় দিকের উপর নয়। জীবিতের উপর, মৃতের উপর নয়। এ জন্যই প্রকৃত প্রস্তাবে আল্লাহ তা’আলার মালিকানা কেবলমাত্র প্রতিদান দিবসেই নয়; পৃথিবীতেও সমস্ত সৃষ্টজগতের প্রকৃত মালিক আল্লাহ্ তা’আলা। তবে এ আয়াতে আল্লাহ তা’আলার মালিকানা বিশেষবাবে ‘প্রতিদান দিবসের’ এ কথা বলার তাৎপর্য কি? আল-কুরআনের অন্য আয়াতের প্রতি লক্ষ্য করলেই বুঝা যায় যে, যদিও দুনিয়াতেও প্রকৃত মালিকানা আল্লাহ তা’আলারই, কিন্তু তিনি দয়াপরবশ হয়ে আংশিক বা ক্ষণস্থায়ী মলিকানা মানজাতিকেও দান করেছেন এবং জাগিতেক জীবনের আইনে এ মালিকানার প্রতি সম্মান ও দেখানো হয়েছে। বিশ্বচরাচরে মানুষ ধন-সম্পদ, জায়গা-জমি, বাড়িঘর এবং আসবাবপত্রের ক্ষণস্থায়ী মালিক হয়েও এতে এক বারে ডুবে রয়েছে। আল্লাহ তা’আলা একথা ঘোষণা করে এ অহংকারী ও নির্বোধ মানবসমাজকে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, তোমাদের এ মালিকানা, আধিপত্য ও সম্পর্ক মাত্র কয়েক দিনের এবং ক্ষণিকের। এমন দিন অতি সত্বরই আসছে, যে দিন কেউই জাহেরী মালিকও থাকবে না, কেউ কারো দাস বা কেউ কারো সেবা পাবার উপযোগীও থাকবে না। সমস্ত বস্তুর মালিকানা এক একক সত্তার হয়ে যাবে। এ আয়াতের বিস্তারিত বর্ণনা সূরা আল-মু’মিনের এ আয়অতে দেওয়া হয়েছেÑ
يَوْمَ هُمْ بَارِزُونَ لَا يَخْفَى عَلَى اللَّهِ مِنْهُمْ شَيْءٌ لِمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ. الْيَوْمَ تُجْزَى كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ لَا ظُلْمَ الْيَوْمَ إِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ.
অর্থ- ‘যেদিন সমস্ত মানুষ আল্লাহ তা’আলার দরবারে উপস্থিত হবে, সেদিন তাদের কোনো কথাই আল্লাহর নিকট গোপন থাকবে না। আজ কার রাজত্ব? (উত্তরে) সে আল্লাহ তা’আলার যিনি একক ও পরাক্রান্ত। আজ প্রত্যেককে তার কর্মফল দান করা হবে। আজ কারো প্রতি অবিচার করা হবে না। আল্লাহ তা’আলা অতি তাড়াতাড়ি হিসাব নিতে পারেন।”-(সূরা গাফির:১৬-১৭)
সূরা আল ফাতিহার প্রথমে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এ সূরার প্রথম তিনটি আয়াতে আল্লাহর প্রশংসা ও তা’রীফের বর্ণনা করা হয়েছে এবং এর তাফসীরে একথা সুস্পষ্টহয়েছে যে, তা’রীফ ও প্রশংসার সাথে সাথে ঈমানের মৌলিক নীতি ও আল্লাহর একত্ববাদের বর্ণনাও সুক্ষ্মভাবে দেওয়অ হয়েছে।
তৃতীয় আয়াতের তাফসীরে আপনি অবগত হলেন যে, এর দু’টি শব্দে তা’রীফ ও প্রশংসার সাথে সাথে ইসলামের বিপ্লবাত্মক মহত্তম আকীদা যথা কিয়ামত ও পরকালের বর্ণনা প্রমাণসহ উপস্থিত কারা হয়েছে।
এখন চতুর্থ আয়াতের বর্ণনা إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ এ আয়াতের এক অংশে তা’রীফ ও প্রশংসা এবং অপর অংশে দোয়া ও দরখাস্ত। نَعْبُدُ عبادت: শব্দ হতে গঠিত। এর অর্থ হচ্ছে- কারো প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা ও ভালবাসার দরুন তাঁর নিকট নিজের আন্তরিক কাকুতিমিনতি প্রকাশ করা। استعانت. نستعين হতে গঠিত। এর অর্থ হচ্ছে কারো সাহায্য প্রার্থনা করা। আয়াতের অর্থ হচ্ছে, ‘আমার তোমারই ইবাদত করি এবং একমাত্র তোমার নিকটই সাহায্য প্রার্থনা করি। মানবজীবন তিনটি অবস্থঅয় অতিবাহিত হয়। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। পূর্বের তিনটি আয়াতের মধ্যে الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ এবং الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ এ দু’টি আয়াতে মানুষকে জনিয়ে ওদওয়া হয়েছে যে, অথীতে সে কেবল একমাত্র আল্রাহ তা’আলার মুখাপেক্ষী ছিল, বর্তমানেও সে একমাত্র তাঁরই মুখাপেক্ষী। সুন্দর ও মানোমুগ্ধকর আকার-আকৃতি এবং বিবেক ও বুদ্ধি দান করেছেন। বর্তমানে তার লালনপালন ও ভরণপোষণের নিয়মিত সুব্যবস্থা তিনিই করেছেন। অতঃপর مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ এর মধ্যে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ভবিষ্যতেও সে আল্লাহ তা’আলারই মুখাপেক্ষী। প্রতিদান দিবসে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো সাহায্য পাওয়া যাবে না।
এ তিনটি আয়াতের দ্বারা যখন একথা প্রমাণিত হলো যে, মানুষ তার জীবনের তিনটি কালেই একান্তভাবে আল্লাহর মুখাপেক্ষী তাই সাধারণ যুক্তির চাহিদাও হচ্ছে- ইবাদতও তাঁরই করতে হবে।
কেননা, ইবাদত যেহেতু অশেষ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে নিজের অফুরন্ত কাকুতিমিনতি নিবেদন করার নাম, সুতরাং তা পাওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন অন্য কোনো সত্তা নেই। ফল কথা হচ্ছে- একজন বুদ্ধিমান ও বিবেকবান ব্যক্তি মনের গভীরতা থেকেই এ স্বতঃস্ফুর্ত স্বকৃতি উচ্চারণ করছে যে আমরা তোমাকে ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করি না। এ মৌলিক চাহিদাই إِيَّاكَ نَعْبُدُ তে বর্ণনা করা হয়েছে।
যখন স্থির হলো যে, অভাব পূরণকারী একক সত্তা আল্লাহ তা’আলা, সুতরাং নিজের সকল কাজে সাহায্যও তাঁর নিকটই চাওয়া দরকার। এ মৌলিক চাহিদারই বর্ণনা وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ এ করা হয়েছে। মোটকথা, এ চতুর্থ আয়াতে একদিকে আল্লাহ তা’রীফ ও প্রশংসার সাথে একথারও স্বীকৃতি রয়েছে যে, ইবাদত ও শ্রদ্ধা পাওয়ার একমাত্র তিনিই যোগ্য। অপরদিকে তাঁর নিকট সাহায্য ও সহায়তার প্রার্থনা করা এবং তৃতীয়ত আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত না করারর শিক্ষাও দেওয়া হয়েছে। এতদসঙ্গে এও বলে দেওয়া হয়েছে যে, কোনো বান্দাই আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকেও অভাব পূরনকারী মনে করবে না। অপর কারো নিকট প্রার্থনার হাত প্রসারিত করা যাবে না। অবশ্য কোনো নবী বা কোনো ওলীর বরাত দিয়ে প্রার্থনা করা এ আয়াতের মর্মবিরোধী নয়।
এ আয়াতে এ বিষয়ও চিন্তা করা কর্তব্য যে, “আমরা তোমারই নিকট সাহায্য চাই” কিন্তু কোন কাজের সাহায্য চাই, তার কোনো উল্লেখ নেই। জমহুর মুফাসসিরীনের অভিমত হচ্ছে- নির্দিষ্ট কোনো ব্যাপারে সাহায্যের উল্লেখ না করে আম বা সাধারণ সাহায্যের প্রাতি ইশারা করাহয়েছে যে, আমি আমার ইবাদত এবং প্রত্যেক ধর্মীয় ও পাথিব কাজে এবং অন্তরে পোষিত প্রতিটি আশা-আকাক্সক্ষায় কেবল তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি।
ইবাদত শুধু নামাজ-রোজারই নাম নয়। ইমাম গাযযালী (র.) স্বীয় গ্রন্থ ‘আরবাঈন’ এ দশ প্রকার ইবাদতের কথা লিখেছেন। যথা- নামাজ, যাকাত, রোজা, কুরআন তিলাওয়অত, সর্বাবস্থায় আল্লাহর স্মরণ, হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা, প্রতিবেশী এবং সাথীদের প্রাপ্য পরিশোধ করা, মানুষকে সৎকাজের আদেশ ও খারাপ কাজ হতে বিরত তাকার উপদেশ দেওয়া, রাসূলের সুন্নত পালনকরা।
একই কারণে ইবাদতে আল্লাহর সাথে কাউকেও অংশীদার করা চলে না। এর অর্থ হচ্ছে, কারো প্রতি ভালবাসা আল্লাহর প্রতি ভালবাসার সমতুল্য হবে না। কারো প্রতি ভয় কারো প্রতি আশা-আকাক্সক্ষা পোষণ আল্লাহর ভয় ও তার প্রতি পোষিত আশা-আকাক্সক্ষার সমতুল্য হবে না। আবার কারো উপর একান্ত ভরসা করা, কারো আনুগত্য ও খেদমত করা, কারো কাজকে আল্লাহর ইবাদতের সমতুল্য আবশ্যকীয় মনে করা, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে মানত করা, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো সামনে স্বীয় কাকুতিমিনতি প্রকাশ করা এবং যে কাজে অন্তরের আবেগ-আকুতি প্রকাশ পায়, এমন কাজ আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো জন্য করা যথা রুকু বা সেজদা করা উত্যদি কোনো অবস্তাতেই বৈধ হবে না।
শেষ তিনটি আয়াতে মানুষের দোয়া ও আবেদনের বিষয়বস্তু এবং এক বিশেষ প্রার্থনা-পদ্ধতি শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। তা হচ্ছে-
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ . صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ.غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ.
অর্থাৎ আমাদেরকে সরল পথ দেখাও; সে সমস্ত মানুষের পথ, যারা তোমার অনুগ্রহ লাভ করেছে। যে পথে তোমার অভিশপ্ত বান্দাগণ চলেছে সে পথে নয় এবং ঐ সমস্ত লোকের রাস্তাও নয় যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।
এ তিনটি আয়াতে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। যেমন সরল পথের হিদায়েতের জন্য যে আবদেন এ আয়াতে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, এর আবেদন কারী যেমনিবাবে সাধারণ মানুষ, সাধারণ মু’মিনগণ, ঠিক অনুরূপভাবে আওলিয়া, গাউস-কুতুব এবং নবী-রাসূলগণও। নিঃসন্দেহে যাঁরা হিদায়েতপ্রাপ্ত, বরং অন্যের হিদায়েতের উৎস্বরূপ, তাঁদের পক্ষে পুনরায় সে হিদায়েতের জন্যই বারংবার প্রার্থনা করার উদ্দেশ্য কি? এ প্রশ্নের উত্তর ‘হিদায়েত’ শব্দের তাৎপর্য পরিপূর্ণরূপে অনুধাবন করার উপর নির্ভরশীল। এ বিষয়ে কিছুটা বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন, যাতে আলোচ্য প্রশ্নের উত্তর ছাড়াও ‘হেদায়েত’ শব্দের তাৎপর্য সম্পর্কে অজ্ঞ লোকেরা যেসব পরস্পর বিরোধিতা আঁচ করেন তাদের সকল প্রশ্নের ও মীমাংসা হয়ে যায়। ইমাম রাগেব ইসফাহানী ‘মুফাদাতুল-কুরআনে’ হিদায়েত শব্দের অতি সুন্দর ব্যখ্যা দিয়েছেন। এর সারমর্ম হচ্ছে, ‘কুকে গন্তব্যস্থানের দিকে অনুগ্রহের সাথে পথ প্রদর্শন করা।’ তাই হিদায়েত করা প্রকৃত প্রস্তাবে একমাত্র আল্লাহ তা’আলারই কাজ এবং এর বিভিন্ন স্তর রয়েছে। হিদায়েতের একটি স্তর হচ্ছে সাধারণ ও ব্যপক। এতে সমগ্র সৃষ্টি অন্তর্ভুক্ত। জড়পদার্থ উদ্ভিদ এবং প্রাণী জগ পর্যন্ত এর আওতাধীন। প্রসঙ্গত প্রশ্ন উঠতে পারে যে, প্রাণহীন জড়পদার্থ বা ইতর প্রাণী ও উদ্ভিদ-জগতের সঙ্গে হিদায়েতের সম্পর্ক কোথায়?
কুরআনের শিক্ষায় স্পষ্টতই এ তথ্য ব্যক্ত হয়েছে যে, সৃস্টির প্রতিটি স্তর, এমনকি প্রতিটি অণু-পরমাণু পর্যন্ত নিজ নিজ অবস্থানুযায়ী প্রাণ ও অনুভূতির তারতম্য রয়েছে। কোনোটাতে তা স্পষ্ট এবং কোনোটাতে নিতান্তই অনুলেলখ্য। যে সমস্ত বস্তুতে তা অতি অল্পমাত্রায় বিদ্যমান সেগুলোকে প্রাণহীন বা অনুভূতিহীন বলা যায়। বুদ্ধি ও অনুভূতির ক্ষেত্রে এ তারতম্যের জন্যই সমগ্র সৃষ্টি জগতের মধ্যে এমাত্র মানুষ ও জিন জাতিকেই শরিয়তের হুকুম-আহকামের আওতাভুক্ত করা হয়েছে। কারণ, সৃষি।টর এ দু’টি স্তরের মধ্যেই বুদ্ধি ও অনুভূতি পূর্ণমাত্রায় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাই বরে একথা বলা যাবে না যে, একমাত্র মানুষ ও জিন জাতি ছাড়া সৃষ্টির অন্য কিছুর মধ্যে বুদ্ধি ও অনুভূতির অস্তিত্ব নেই। কেননা, আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন-
وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَلَكِنْ لَا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ
অর্থাৎ এমন কোনো বস্তু নেই যা আল্লাহর প্রশংসায় তাসবীহ পাঠ করে না, কিন্তু তোমরা তাদের তাসবীহ বুঝতে পার না। (সুরা বনী-ইসরাঈল;৪৪)
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يُسَبِّحُ لَهُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالطَّيْرُ صَافَّاتٍ كُلٌّ قَدْ عَلِمَ صَلَاتَهُ وَتَسْبِيحَهُ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِمَا يَفْعَلُونَ.
অর্থাৎ তোমরা কি জান না যে, আসমান-জমিনে যা কিছু রয়েছে, সকলেই আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা ও গুণগান করে? বিশেষত পাখিকুল যারা দু’পাখা বিস্তার করে শূন্যে উড়ে বেড়ায়, তাদের সকলেই স্ব-স্ব দোয়া তাসবীহ সম্পর্কে জ্ঞাত এবং আল্লাহ তা’আলাও ওদের তাসবীহ সম্পর্কে খবর রাখেন। -(সূরা নূর:৪১)
একথা সর্বজন বিদিত যে, আল্লাহ তা’আলার পরিচয়ের উপরই তাঁর তা’রীফ ও প্রশংসা নির্ভরশীল। আর এ কথাও স্বতঃসিদ্ধ যে, আল্লাহর পরিচয় লাভ করাই সর্বাপেক্ষা বড় জ্ঞাণ। এটা বুদ্ধি-বিবেক ও অনুভূতি ব্যতীত সম্ভব নয়। এ আয়াতগুরো দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, সৃস্টিজগতের প্রতিটি বস্তুরই প্রাণ ও জীবন আছে এবং বুদ্ধি ও অনুভূতিও রয়েছে। তবে কোনো কোনোটির মদ্যে পরিমাণ এত অল্প যে, সাধারণ দৃষ্টিতে তা অনুভব করা যায় না। তাই পরিভাষাগতভাবে এগুলোকে প্রাণহীন ও বুদ্ধিহীন জড়পদার্থ বলা হয়। আর এ জন্যেই ওদেরকে শরয়ী আদেশের আওতাভুক্ত করা হয়নি। গোটা বস্তুজগত সম্পর্কিত এ মীমাংসা আল-কুরআনে যে যুগেই দেওয়া হয়েছিল, যে যুগে পৃথিবীর কোথাও আধুনিক কালের কোনো দার্শনিকও ছিল না, দর্শনবিদ্যার কোনো পুস্তকও রচিত হয়নি। পরবর্তী যুগের দার্শনিকগণ এ তথ্যের যথার্থতা স্বীকার করেছেন এবং প্রাচীন দার্শনিকদের মদ্যেও এত মত পোষণ করার মতো অনেক লোক ছিল। মোটকথা, আল্লাহর হিাদয়েতের এ প্রথম স্তরে সমস্ত সৃষ্টিজগত যথা জড়পদার্থ, উদ্ভিদ, প্রাণীজগত, মানবম-লী ও জিন প্রভৃতি সকলেই অন্তর্ভূক্ত। এ সাধারণ হিদায়েতের উল্লেখ আল-কুরআনের এ আয়াতে اعطى كل شئ خلقه ثم هدى করা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলা প্রত্যেক বস্তুর অস্তিত্ব দান করেছেন এবং সে অনপাতে তাকে হিদায়েত দান করেছেন। -(সূরা আ’লা:১-৩)
এ বিষয়ে সূরা আ’লায় ইরশাদ হয়েছেÑ
سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى . الَّذِي خَلَقَ فَسَوَّى . وَالَّذِي قَدَّرَ فَهَدَى .
অর্থাৎ তোমরা তোমাদের মহান পালনকর্তঅর গুণগান কর। যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং সেগুলোকে সঠিক অবস্থা দান করেছেন। যিনি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন এবং পথ দেখিয়েছেন। (সূরা আ’লা:১-৩)
অর্থাৎ যিনি সমস্ত সৃষ্টি জগতের জন্য বিশেষ অভ্যাস এবং বিশেষ দায়িত্ব নির্ধারণ করেছেন এবং সে মেজাজ ও দায়িত্বের উপযোগী হিদায়েত দান করেছেন। এ ব্যাপারে হিদায়েতের পরিকল্পনা অনুযায়ী সৃষ্টি জগতের প্রতিটি বস্তুই অতি নিপুণভাবে নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করেক চলেছে। যে বস্তুকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সে সেই কাজ অত্যন্ত গুরুত্ব ও নৈপুণ্যের সাথে পালন করছে। যথাÑ মুখ হতে নির্গত শব্দ নাক বা চক্ষু কেউই শ্রবণ করতে পারে না, অথচ এ দু’টি মুখের নিকটতম অঙ্গ। পক্ষান্তরে এ দায়িত্ব আল্লাহ তা’আলা যেহেতু কানকে অর্পণ করেছেন, তাই একমাত্র কানই মুখের শব্দ শ্রবণ করে ও বুঝে। অনুরূপভাবে কান দ্বারা দেখা বা ঘ্রাণ লওয়ার কাজ করা চলে না। নাক দ্বারা শ্রবণ করা বা দেখার কাজও করা চলে না।
সূরা মরিয়মে এ বিষয়ে ইরশাদ হয়েছেÑ إِنْ كُلُّ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِلَّا آتِي الرَّحْمَنِ عَبْدًا
অর্থাৎ আকাশ ও জমিনে এমন কোনো বস্তু নেই, যা আল্লাহর বান্দারূপে আগমন করেনি। (মারইয়াম:৯৩)
হিদায়েতের দ্বিতীয় স্তর এর তুলনায় অনেকটা সংকীর্ণ। অর্থাৎ সে সমস্ত বস্তুর সাথে জড়িত, পরিভাষায় যাদেরকে বিবেকবান বুদ্ধিসম্পন্ন বলা হয়। অর্থাৎ মানুষ এবং জিন জাতি। এ হিদায়েত নবী-রাসূল ও আসমানী কিতাবের মাধ্যমে প্রত্যেক মানুষের নিকট পৌঁছেছে। কেউ এ হিদায়েতকে গ্রহণ করে মু’মিন হয়েছে আবার কেউ একে প্রত্যাখ্যান করে কাফির-বেদীনে পরিণত হয়েছে।
হিদায়েতের তৃতীয় স্তর আরো বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। তা শুধু মু’মিন ও মুত্তাকী বা ধর্ম-ভীরুদের জন্য। এ হিদায়েত আল্লাহহ তা’আলার পক্ষ থেকে কোনো প্রকার মাধ্যম ব্যতীতই মানুষকে প্রদান করা হয়। এরই নাম তৌফিক। অর্থাৎ এমন অবস্থা, পরিবেশ ও মনোভাব সৃষ্টি করে দেওয়অ যে, তার ফলে কুরআনের হিদায়েতকে গ্রহণ করা এবং এর উপর আমল করা সহজসাধ্য হয় এবং এর বিরুদ্ধাচরণ কঠিন হয়ে পড়ে। এ তৃতীয় স্তরের পরিসীমা অতি ব্যপক। এ স্তরই মানবের উন্নতির ক্ষেত্র। নেক কাজের সাথে হিদায়েতের বৃদ্ধি হতে থাকে। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে এ বৃদ্ধির উল্লেখ রয়েছেÑ
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا
অর্থাৎ “যারা আমার পথে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে আমি তাদেরকে আমার পথে আরো অধিকতর অগ্রসর হওয়অর পথ অবশ্যই দেখিয়ে থাকি। (আনকাবুত:৬৯) এটি সেই কর্মক্ষেত্র যেখানে নবীÑরাসূল এবং বড় বড় ওলী-আওলিয়া, কুতুবগণকেও জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আরো অধিকতর হিদায়েতের ও তৌফিকের জন্য চেষ্টায় রত থাকতে দেখা গেছে।
হিদায়েতের এ ব্যাখ্যঅর দ্বারা স্পষ্টভাবে বুঝা গেল যে, হিদায়েত এমন এক বস্তু যা সকলেই লাভ করেছে এবং এর আধিক্য লাভ করার জন্য বড় হতে বড় ব্যক্তির পক্ষেও কোনো বাধা-নিষেধ নেই। এ জন্যই সূরা আলÑফাতিহারয় গুরুত্বপূর্ণ দোয়ারূপে হিদায়েত প্রার্থনা শিক্ষা দেওয়অ হয়েছে, যা একজন সাধারণ মু’মিনের জন্যও উপযোগী, আবার একজন বড় হতে বড় রাসূলের জন্য উপযোগী। এ জন্যই হযরত রাসূলে আকরাম (স.) এর শেষ জীবনে সূরা ফাতহতে মক্কা বিজয়ের ফলাফল বর্ণনা করতে গিয়ে একথাও বলা হয়েছে যে, وَيَهْدِيَكَ صِرَاطًا مُسْتَقِيمًا অর্থাৎ মক্কা বিজয় এ জন্যই আপনার দ্বারা সম্পন্ন করা হয়েছে, যাতে সিরাতে-মুস্তাকীমের হিদায়েত লাভ হয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) কেবল নিজেই হিদায়েতপ্রাপ্ত ছিলেন না; বরং অন্যের জন্যও ছিলেন হিদায়েতের উৎস। এমতাবস্থায় তাঁর হিদায়েত লাভের একমাত্র অর্থ হতে পারে, এসময় হিদায়েতের কোনো উচ্চতর অবস্থা তিনি লাভ করেছেন।
হিদায়েতের এ ব্যখ্যা পত্রি কুরআন বুঝাবার ক্ষেত্রে যেসব ফায়দা প্রান করবে সংক্ষেপে তা নিন্মরূপÑ
ক. পবিত্র কুরআনের কোথাও কোথাও মু’মিন ও কাফের নির্বিশেষে সবার জন্যই হিদায়েত শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। আবার কোথাও শুধুমাত্র মুত্তাকীদের জন্য বিশেষ অর্থে হিদায়েত শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এতে করে অজ্ঞ লোকদের পক্ষে সন্দেহে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। কিন্তু হিদায়েতের সাধারণ ও বিশেষ স্তরসমূহ জানার পর এ সন্দেহ আপনা-আপনিতেই দূরীভূত হয়ে যাবে। বুঝতে হবে যে, কারো বেলায় ব্যপক অর্থে এবং কারো বেলায় বিশেষ অর্থে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।
খ. আল-কুরআনের স্থানে স্থানে এরশাদ হয়েছৈ যে, জালেমও ফাসকেদেরকে আল্লাহ তা’আলা হেদায়েত দান করেন না। অন্যত্র বারবার ইরশাদ হয়েছে যে, তিনি সকলকেই হিদায়েত দান করেন। এর উত্তর ও হিদায়েতের স্তরসমূহের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলে দেওয়া হয়েছে যে, হিদায়েতের ব্যপক অর্তে সকলেই হিদায়েতপ্রাপ্ত এবং বিশেষ অর্থে জালেম ও ফাসেকরা বাদ পড়েছে।
গ. হিদায়েতের তিনটি স্তরের মধ্যে প্রথম ও তৃতীয় স্তর সরাসরি আল্লাহ তা’আলার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ পর্যায়ের হিদায়েতের একান্তভাবে একমাত্র তাঁরই কাজ। এতে নবী-রাসূলগণেরও কোনো অধিকার নেই। নবী-রাসূলগণের কাজ শুধু হিদায়েত দ্বিতীয় স্তরে সীমিত। কুরআনের যেখানে যেখানে নবী-রাসূলগণকে হেদায়েতকারী বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তা হেদায়েতের দ্বিতীয় স্তরের ভিত্তিতেই বলা হয়েছে। আর যেখানে ইরশাদ হয়েছেÑ إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ অর্থাৎ আপনি যাকে চান তাকেই হেদায়েত করতে পারবেন না” এতে হিদায়েতের তৃতীয় স্তরের কথা বলা হয়েছৈ। অর্থাৎ কাউকে তৌফিক দান করা আপনার কাজ নয়।
মোট কথা اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ একটি ব্যপক ও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দোয়া, যা মানুষকে শিক্ষা দেওয়াহয়েছে। মানব সমাজের কোনো ব্যক্তিই এর আওতার বাইরে নেই। কেননা, সরল-সঠিক পথ ব্যতীত দীন-দুনিয়ার কোনো কিছুতেই উন্নতি ও সাফল্য সম্ভব নয়। দুনিয়ার আবর্তন-বিবর্তনের মধ্যেও সিরাতে-মুস্তাকীমের প্রার্থনা পরশপাথরের মতো কিন্তু মানুষ তা লক্ষ্য করে না। আয়াতের অর্থ হচ্ছেÑ “আমাদেরকে সরল পথ দেখিয়ে দিন।”
সরল পথ কোনটি? সোজা সরল রাস্তা’ সে পথকে বলে, যাতে কোনো মোড় বা ঘোরপ্যাচ নেই। এর অর্থ হচ্ছে, ধর্মের সে রাস্তা যাতে ইফরাত বা তাফরতি এর অবকাশ নেই। ইফরাতের অর্থ সীমা অতিক্রম করা এবং তাফরীত অর্থ মর্জিমতো কাট-ছাট করে নেওয়া। ইরশাদ হয়েছে
صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ
অর্থাৎ যে সকল লোক আপনার অনুগ্রহ লাভ করেছে তাদের রাস্তা। যেসকল ব্যক্তি আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করেছে, তাদের পরিচয় অন্য একটি আয়াতে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছেÑ
الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ
অর্থাৎ যাদের প্রতি আল্লাহ পাক অনুগ্রহ করেছেন, তাঁরা হচ্ছে নবী, সিদ্দীক, শহীদএবং সৎকর্মশীল সালেহীন। (নিসা:৫৯)। আল্লাহর দরবারে মকবুল উপরোক্ত লোকদের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তর নবীগণের। অতঃপর নবীগণের উম্মতের মধ্যে যাঁরা সর্বাপেক্ষা বড় মরতবা ও মর্যাদার অধিকারী, তাঁরা হলেন সিদ্দীক। যাঁদের মধ্যে রূহানী কামালিয়াত ও পরিপূর্ণতা রয়েছে, সাধারণ ভাষায় তাঁদেরকে ‘আওলিয়া’ বলা হয়। আর যাঁরা দীনের প্রয়োজনে স্বীয় জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করেছেন, তাঁদেরকে বলা হয় শহীদ। আর সালেহীন হচ্ছেন- যাঁরা ওয়অজিব, মোস্তাহাব প্রভৃতি সর্বক্ষেত্রে শরিয়তের পুরোপুরি অনুসরণ ও আমলকারী, সাধারণ পরিভাষায় এদেরকে দীনদার বলা হয়।
এ আয়াতের প্রথম অংশে হ্যঁ-সূচক বাক্য ব্যবহার করে সরল পথের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। উপরোক্ত চার স্তরের মানুষ যে পথে চলেছেন তাই সরল পথ। পরে শেষ আয়াতে না-সূচক বাক্য ব্যবহার করেও এর সমর্থন করা হয়েছে। বলা হয়েছে غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ অর্থাৎ যারা আপনার অভিসম্পাতগ্রস্ত তাদের পথ নয় এবং তাদের পথও নয়, যারা পথহারা হয়েছে। الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ বলতে ঐ সকল লোককে বুঝানো হযেছে, যারা ধর্মের হুকুম আহকামকে বুঝে-জানে, তবে স্বীয় অহমিকা ও ব্যক্তিগত স্বাাের্থর বশবর্তী হয়ে বিরুদ্ধাচরণ করেছে। অন্য শব্দে বলা যায়, যাঁরা আল্লাহ তা’আলার আদেশ মান্য করতে গাফলতি করেছে। যেমন, সাধারণভবে ইহুদিদের নিয়ম ছিল, সামান্য স্বার্থের জন্য দীনের নিয়ম-নীতি বিসর্জন দিয়ে তারা নবী-রাসূলগণের অবমাননা পর্যন্ত করতে দ্বিধাবোধ করতো না। الضَّالِّينَ তাদেরকে বলাহয়, যারা না বুঝে অজ্ঞতার দরুন ধর্মীয় ব্যপারেভুল পথের অনুসারী হয়েছে এবং ধর্মের সীমালঙ্ঘন করে অতিরঞ্জনের পথে অগ্রসর হয়েছে। যথাÑ নাসারাগণ। তারা নবীর শিক্ষাকে অগ্রাধিকার প্রদানের নামে বাড়াড়ি করেছে; যেমন নবীদেরকে আল্লাহর পর্যায়ে পৌছে দিয়েছে। ইহুদিদের বেলায় এটা অন্যায় এ জন্য যে, তারা আল্লাহর নবীদের কথা মানোনি; এমন কি তাঁদেরকে হত্যা পর্যন্ত করেছে।
আয়াতের সারমর্ম হচ্ছে- আমরা সে পথ চাই না, যা নফসানী উদ্দেশ্যের অনুগত হয় এবং মন্দ কাজে উদ্বুদ্ধ করেও ধর্মের মধ্যে সীমালঙ্ঘনের প্রতি প্ররোচিত করে। সে পথই চাই না, যে পথ অজ্ঞতা ও মূর্খতার দরুন ধর্মের সীমারেখা অতিক্রম করে। বরং এ দু’য়ের মধ্যবর্তী সোজা-সরল পথ চাই। যার মধ্যে না অীতরঞ্জন আছে, আর না কম-কছুরী আছে এবং যা নফসানী প্রভাব ও সংশয়ের উধ্বে।
এ সমগ্র সূরার সারমর্ম হচ্ছে এই দোয়া- হে আল্লাহ! আমাদেরকে সরল পথ দান করুন। কেননা, সরল পথের সন্ধান লাভ করাই সবচেয়ে বড় জ্ঞাণ ও সর্বাপেক্ষা বড় সফলতা। বস্তুত সরল পথের সন্ধানে ব্যর্থ হয়েই দুনিয়ার বিভিন্ন জাতি ধ্বংস হয়েছে। অন্যথায় অমুসলমানদের মধ্যে সৃষ্টি কর্তার পরিচয় লাভ করা এবং তাঁর সন্তুষ্টির পথ অনুসরণ করার আগ্রহ-আকুতির অভাব নেই। এ জন্যই পবিত্র কুরআনে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় পদ্ধতিতেই সিরাতে-মুস্তাকীমের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে।
আল্লাহর কিতাবের শিক্ষা এবং তাঁর প্রিয় বান্দাদের অনুসণের মধ্যেই সরল পথ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা রয়েছে: এখানে একটা বিষয় বিশেষভাবে অনুধাবনযোগ্য। আর এ ব্যাপারে একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে জ্ঞানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়ে যায়। তা হচ্ছে, সিরাতে-মুস্তাকীম নির্ধারণ করার জন্য বস্তুত সিরাতে রাসূল (সা.) সিরাতে-কুরআন বলে দেওয়াই তো যথেষ্ট ছিল। উপরোক্ত দু’টি পথ চি=িত করা যেমন সংক্ষিপ্ত ছিল, তেমনি ছিল, তেমনি ছিল সুস্পষ্ট। কেননা সমগ্র কুরআনই তো সিরাতে মুস্তাকীমের বিস্তারিত বর্ণনা। অপরদিকে রাসূল (সা.) এর সমগ্র শিক্ষা হচ্ছে কুরআনেরই বিস্তারিত বর্ণনা। অথচ আলোচ্য এ ছোট্ট সূরাকির দু’টি আয়াতে সহজ এবং স্বচ্ছ দু’টি পন্থা বাদ দিয়ে প্রথমে ইতিবাচক এবং পরে নেতিবাচক পদ্ধতিতে সিরাতে-মুস্তাকীমকে চিহ্ণিত করতে গিয়ে বলেছেন, যদি সিরাতে-মুস্তাকীম চাও, তবে এ সমস্ত লোককে তালাশ করে তাদের পথ অবলম্বন কর। কেননা, রাসূল (সা.) এ দুনিয়াতে চিরকাল অবস্থান করবেন না। তাঁর পরে আর কোনো নবী বা রাসূলেরও আগমন হবে না। তাই তাঁদের মধ্যে নবীগণ ছাড়াই সিদ্দীক, শহীদান ও সালেহীনকেও অন্তর্ভুক্ত করে দেওয়া হযেছে। কারণ, কিয়ামত পর্যন্ত এদের অস্তিত্ব দুনিয়াতে থাকবে।
ফল কথা এই যে, সরল পথ অনুসন্ধানের জন্য আল্লাহ তা’আলা কিছুসংখ্যক মানুষের সন্ধান দিয়েছেন; কোনো পুস্তকের হাওয়ালা দেননি। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন সাহাবীগণকে জানিয়েছেন যে, আমার উম্মতও পূর্ববর্তী উম্মতগণের ন্যায় সত্তরটি দলে বিভক্ত হয়ে যাবে। তন্মধ্যে মাত্র একটি দলই পথে থাকবে। তখন সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন সেটি কোন দল? প্রত্যুত্তরে তিনি যা বলেছেন, তাতেও তিনি কিচু লোকের সন্ধান দিয়েছেন। ইরমাদ করেছেন- ما انا عليه واصضابى অর্থাৎ আমি এবং আমর সাহাবীগণ যে পথে রয়েছি সে পথই সত্য ও ন্যায়ের পথ। বিশেষ ধরনের এ বর্ণনা পদ্ধতিতে হয়তো সেদিকে ইশারা করা হয়েছে যে, মানুষের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা-দীক্ষা কেবলমাত্র কিতাব ও বর্ণনা দ্বারা সম্ভব হয় না; বরং দক্ষ ব্যক্তিগণের সাহচর্য ও সংশ্রবের মাধ্যমেই তা সম্ভব হতে পারে। বাস্তবপক্ষে মানুষের শিক্ষক এবং অীভভাবক মানুষই হতে পারে। কেবল কিতাব বা পুস্তক শিক্ষক ও অভিভাবক হতে পারে না।
এ এমনই এক বাস্তব সত্য যে, দুনি য়ার যাবতীয় কাজকর্মেও এর নিদর্শন বিদ্যমান। শুধু পূথিগত বিদ্রঅর দ্বারবা কেউ না পারে কাপড় সেলাই করতে, না পারে আহারকরতে। শুধু ডাক্তারী পুথিপত্র পাঠ করে কেউ ডাক্তার হতে পারে না। ইঞ্জিনিয়ারিং বইপত্র পাঠ কের কেউ ইঞ্জিনিয়ারও হতে পারে না। অনুরূপভাবে শুধু কুরআন-হাদীস পাঠ করাই কোনো মাুষের পরিপূর্ণ তা’লীম ও তরবিয়তের জন্য যথার্থ হতে পারে না। যে পর্যন্ত কোনো বিজ্ঞ লোকের নিকট বাস্তববাবে শিক্ষা গ্রহণ না করে, সে পর্যন্ত দীনের তা’লীম অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কুরআন ও হাদীসের ব্যাপারে অনেকেই এ ভুল দারণা পোষণ করে যে, কুরআনের অর্থ ও তাফসীর পাঠ করে কুরআন ও হাদীস সম্পর্কে গভীর জ্ঞানের অধিকারী হওয়া যায়। এটা সম্পূর্ণ প্রকৃতিবিরুদ্ধ ধারণা। কেননা যদি কিতাব এ ব্যাপারে যথেষ্ট হতো তবে নবী ও রাসূল প্রেরণের প্রয়োজন হতো না। অথচ কিতাবের সাথে রাসূলকে শিক্ষকরূপে পাঠানো হয়েছে।
আর সরল পথ নির্ধারণের ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক স্বীয় মকবুল বান্দারেদ তালিকা প্রদানও এর প্রমাণ যে, শুধুমাত্র কিতাবের পাঠই পূর্ণ তা’লীম ও তরবিয়তের জন্য যথেষ।ট নয়; বরং কোনো কোনো বিজ্ঞা লোকের নিকট এর শিক্ষালাভ করার প্রয়েঅজনীয়তা রয়েছে।
বুঝা গের, মানুষের প্রকৃত মুক্তি এবং কল্যঅন প্রাপ্তির জন্য ুদটি উপাদানের প্রয়োজন। প্রথম, আল্লাহর কিাতাব যাতে মানবজীবনের সকল দিকের পথনির্দেশ রয়েছে এবং অপরটি হচ্ছে আল্লাহর প্রিয় বান্দা বা আল্লাহ ওয়ালাগণ। তাঁদের কাছ থেকে ফায়দা হাসিল করার মাপকাঠি হচ্ছে- আল্লাহর কিতাবের নিরিখে তাঁদের পরীক্ষা করতে হবে। এ পরীক্ষায় যারা টিকবে না তারা আল্লাহর প্রিয়পাত্র নয় বলেই যারা সঠিক অর্তে আল্লাহর প্রিয় পাত্র স্থির হয়, তাদের নিকট আল্লাহর কিতাবের শিক্ষা লাভ করে তৎ প্রতি আমল করতে হবে।
মতানৈক্যের কারণ: একশ্রেণীর লোক শুধু আল্লাহর কিতাবকে গ্রহণ করেছে এবং প্রিয়পাত্রগণ থেকে দূরে সরে গিয়েছে; তাদের তাফসীর ও শিক্ষাকে কোনো গুরুত্বই দেয়নি। আবার কিচু লোক আল্লাহর প্রিয়াত্রগণকেই সত্যের মাপকাঠি স্থির করে আল্লাহর কিতাব থেকে দূরে সরে পড়েছে। বলা বাহুল্য, এ দু পথের পরিণতিই গোমরাহী।
জেনে রাখ! সুরাতুল-ফাতিহাতে প্রথমে আল্লাহ তা’আলার প্রশংসা ও তা’রীফ রয়েছে। অতঃপর তাঁর ইবাদতের উল্লেখ রয়েছে। এতদ সঙ্গে এ কথারও উল্লেখ করা হয়েছে যে, আমরা তাঁকে ব্যতীত অন্য কাউকেও অভাব পূরণকারী মনে করি না। প্রকারান্তরে এটি আল্লাহর সাথে মানুষের একটা শপথ বিশেষ। অতঃপর রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থনা, যাতে মানুষেল সর্বপ্রকার প্রয়োজন এবং আশাÑআকাক্সক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, এতে কতিপয় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় এবং গুরুত্বপূর্ণ মাস’আলাও সন্নিবেশিত হয়েছে। প্রাসঙ্গিক কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা হচ্ছেÑ
দোয়া করার পদ্ধতি: এ সূরায় একটা বিশেষ ধরণের বর্ণনারীতির মাধ্যমে মানুষকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, যখন আল্লাহর নিকট কোনো দোয়া বা কোনো আকুতি পেশ করতে হয়, তখন প্রথমে তাঁর গুণকীর্তন কর, তাঁর দেওয়অ সীমাহীন নিয়ামতের স্বীকৃতি দাও। অতঃপর একমাত্রা তিনি ছাড়া অন্য কাউকেও দাতা ও অভাব পূরণকারী মনে কর না কিংবা অন্য কাউকেই ইবাদতের যোগ্য বলে স্বীকার করো না। অতঃপর স্বীয় উদ্দেশ্যের জন্য আরজী পেশ কর। এ নিয়মে যে দোয়া করা হয়, তা কবুল হওয়ার ব্যাপারে বিশেষ আশা করা যায়। দোয়া করতেও এমন ব্যাপক পদ্ধতি অবলম্বন কর, যাতে মানুষের সকল মকসুদ তার অন্তর্ভূক্ত থাকে। যাথা, সরল পথ লাভ করা এবং দুনিয়ার যাবতীয় কাজে সরল-সঠিক পথ পাওয়া, যাতে কোথাও কোনো ক্ষতি বা পদস্খলনের আশংকা না থাকে। মোটকথা, এ স্থলে আল্লাহ তা’আলার পক্ষহতে তাঁর তা’রীফ প্রশংসাকরর প্রকৃত উদ্দেশ্যই হলো মানবকুলকে শিক্ষা দেওয়া।
আল্লাহর প্রশংসা করা মানুষের মৌলিক দায়িত্ব: এ সূরার প্রথম বাক্যে আল্লাহর প্রশংসা শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। প্রশংসা সাধারণত কোনো গুণের বা প্রতিদানের পরিপ্রেক্ষিতে উল্লেখ হয়ে থাকে। কিন্তু এখানে কোনো গুণের বা প্রতিদানের উল্লেখ নেই।
এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, আল্লাহর নিয়ামত অগণিত। কোনো মানুষ এর পরিমাপ করতে পারে না। কুরআনের ইরশাদ হয়েছে- وَإِنْ تَعُدُّوا نِعْمَةَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا অর্থাৎ যদি তোমরা আল্লাহর নিয়ামতের গণনা করতো চাও, তবে তা পারবে না। মানুষ যদি সারা বিশ্ব হতে মুখ ফিরিয়ে শুধুমাত্র নিজের অস্তিত্বের প্রতিই দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, তবে বুঝতে পারবে যে, তার শরীরই এমন একটি ক্ষুদ্র জগত, যাতে বৃহৎ জগতের সকল নিদর্শন বিদ্যমান। তার শরীর জমিন তুল্য। কেশরাজি উদ্ভিদ-তুল্য। তার হাড়গুলো পাহাড়ের মতো এবং সিরা-ইপশিরা যাতে রক্ত চলাচল করে, সেগুরো নদী-নালা বা সমুদ্রের নমুনা। দু’টি বস্তুর সংমিশ্রণে মানুষের অস্তিত্ব। একটি শরীর ও অপরটি আত্মা। এ কথাও স্বীকৃত যে, মানবদেহে আত্মা সর্বাপেক্ষা উত্তম অংশ আর তার শরীর হচ্ছে আত্মার অনুগত এবং অপেক্ষাকৃত নিকৃষ্ট মানের অধিকারী। এ নিকৃষ্ট অংশের পরীক্ষা-নিরীক্ষাকারী চিকিৎসকগণ বলেছেন যে, মানবদেহে আল্লাহ তা’আলা পাঁচ হাজার প্রকার উপাদান রেখেছেন। এতে তিন শতেরও অধিক জোড়া রয়েছে। প্রত্যেকটি জোড়া আল্লাহর কুদরতে এমন সুন্দর ও মজবুতভাবে দেওয়া হয়েছে যে, সর্বদা নড়াচড়া করা সত্বেও তার মধ্যে কোনো পরিবর্তন হয় না এবং কোনো প্রকার মেরামতেরও প্রয়োজন হয় না। সাধারণত মানুষের বয়স ষাট-সত্তর বছর হয়ে থাকে। এ দীর্ঘ সময় তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো সর্বদা নড়াচড়া করেছে, অথচ এর মধ্যে কোনো পরিবর্তণ দেখা যায়না। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন- نَحْنُ خَلَقْنَاهُمْ وَشَدَدْنَا أَسْرَهُمْ অর্থাৎ আমিই মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং আমিই তাদের জোড়াগুলোকে মজবুত করেছি। (দাহর:২৮) এ কুদরতী মজবুতির পরিণাম হয়েছে এই যে, সাধারণভাবে উহা অত্যন্ত নরম ও নড়বড়ে অথচ এ নড়বড়ে জোড়া সত্তর বছর বা এর চাইতেও অধিক সময় পর্যন্ত কমরত থাকে। মানুষের অঙ্গগুলোর মধ্যে শুধু চক্ষুর কথাই ধরুন, এতে আল্লাহ তা’আলার অসাধারন হেকমত প্রকাশিত হয়েছে, সারাজীবন সাধনাকরেও এ রহস্যটুকু উদ্ধার করা সম্ভব নয়।
এ চোখের এক পলকের কার্যক্রম লক্ষ্য করলে বুঝতে পারা যবে যে, এক এক মিনিটের মার্যক্রমে আল্লাহ তা’আলার কত নিয়ামত যে কাজ করছে, তা ভেবে অবাক হতে হয়। কেননা চক্ষুর ভিতরের শক্তি কাজ করছে, অনুরূপভাবে বহির্জগতের সৃষ্টিরাজিও এতে বিশেষ অংশ নিচ্ছে। সূর্যের কিরণ না থাকলে চোখের দৃষ্টির জন্য বিশ্বের সকল শক্তি ব্যবর্হত হয়। এতো একবারের দৃষ্টি। এখন দিনে কতবার দেখে এবং জীবনে কতবার দেখে তা হিসাব করা মানুষের শক্তির উধ্বে। এমনিভাবে কান, জিহবা, হাতা ও পায়ের যত কাজ আছে তাতে সমগ্র জগতের শক্তি যুক্ত হয়ে কার্য সমাধা হয়। এতো সে মহা দান যা প্রতিটি জীবিত মানুষ ভোগ করে। এতে রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্রের কোনো পার্থক্য নেই। তা ছাড়া আল্লাহ তা’আলার অসংখ্য নিয়ামত এমন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে যা প্রতিটি প্রাণী ভোগ করে ও উপকৃত হয়। আকাশ-জমিন এবং এ দু’টির মধ্যে সৃষ্ট সকল বস্তু যথা চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র, বায়ু প্রভৃতি প্রতিটি প্রাণীই উপভোগ করে।
এরপর আল্লাহর বিশেষ দান, যা মানুষকে হেকমতের তাকিদে কম-বেশি দেওয়া হয়েছে ধন-সম্পদ, মান-সম্মান, আরাম-আয়েশ সবই এর অন্তর্ভূক্ত। যদিও একথা অত্যন্ত মৌলিক যে, সাধারণ য়িামত যা সকল স্তরের মানুষের মধ্যে সমভাবে উপভোগ্য; যথা- আকাশ, বাতাস, জমি এবং বিরাট এ প্রকৃতি, এ সমস্ত নিয়ামত বিশেষ নিয়ামতের (যথা ধন-স্মপদ) তুলনায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও উত্তম। অথচ এসব নিয়ামত সকল মানুষের মধ্যে সমভাবে পরিব্যপ্ত বলে, এত বড় নিয়ামতের প্রতি মানুষ দৃষ্টিপাত করে না। ভাবে, কি নিয়ামত! বরং আশপাশের সামান্য বস্তু যথা, আহার্য, পানীয়, বসবাসের নির্ধারিত স্থান, বাড়ি-ঘন প্রভৃতির প্রতিইি তাদের দৃষ্টি সাধারণত সীমাবদ্ধ থাকে।
মোটকথা, সৃষ্টিকর্তা মানবজাতির জীবনÑধারণ এবং দুনিয়ার জীবনে বেঁচে থাকার সুবিধার্থে যে অফুরন্ত নিয়ামত দান করেছেন, তার অতি অল্পই এ প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের পক্ষে দুনিয়ার জীবনে চোখ মেলেই মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেই মহান দাতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকা ছির স্বাভাবিক। বলা বাহুল্য যে, মানবজীবনের সে চাহিদার প্রেক্ষিতে কুরআনের সর্বপ্রথম সূরার সর্বপ্রথম বাক্যে الْحَمْدُ ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেই মহান সত্তার তারীফ বা প্রশংসাকেইবাদতের শীর্ষ স্থানে রাখা হয়েছে।
রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন যে, আল্লাহ তা’আলা তাঁর কোনো নিয়ামত কোনো বান্দাকে দান করার পর যখন সে الْحَمْدُ لِلَّهِ বলে তখন বুঝতে হবে যা সে পেয়েছে, এই শব্দ তার চেয়ে অনেক উত্তম। (কুরতুবী)
অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে যে, যদি কোনো ব্যক্তি বিশ্ব-চরাচরের সকল নিয়ামত লাভ করে এবং সেজন্য সে আলহামদুলিল্লাহ বলে তবে বুঝতে হবে যে, তার الْحَمْدُ বলা সরা বিশ্বের নিয়ামতসমূহ অপেক্ষা অতি উত্তম।(কুরতুবী)
কোনো কোনো আলেমের মন্তব্য উদ্ধৃত করে কুরতুবী লিখেছেন যে, মুখে الْحَمْدُ لِلَّهِ বলা একটি নিযামত এবং এ নিয়ামত সারা বিশ্বের সকল নিয়ামত অপেক্ষা উত্তম। সহীহ হাদীসে আছে যে, الْحَمْدُ لِلَّهِ পরকালের তৌলদ-ের অর্ধেক পরিপূর্ণ করবে।
হযরত শকীক ইবনে ইবরাহীম (র.) الْحَمْدُ এর ফজিলত বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন যে, যখন আল্লাহ তা’আলা তোমাদের কোনো নিয়ামত দান করেন, তখন প্রথমে দাতাকে চেন এবং পরে তিনি যা দান করেছেন তাতে সন্তুষ্ট থাক। আর তাঁর দেওয়অ শক্তি ও ক্ষমতা তোমাদের শরীরে যতক্ষণ থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁর অবাধ্যতার কাছেও যেওনা।
দ্বিতীয় শব্দ الله এর সাথে لام বর্ণটি যুক্ত। যাকে আরবি ভায়ার নিয়ম অনুযায়ী খাস لام বলা হয়। যা কোনো আদেশ বা গুণের বা গুণের বিশেষত্ব বুঝায়। এখানে অর্থ হচ্ছে যে, শুধু প্রশংসাই মানবের কর্তব্য নয়; বরং এ প্রশংসা তাঁর অস্তিত্বের সাথে সংযুক্ত। বাস্তবিক পক্ষে তিনি ব্যতীত এ জগতে অন্য কেউ প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য নয়। এর বিস্তারিত বর্ণনা পূর্বে করা হয়েছে। এতদসঙ্গে এও তাঁর নিয়ামত যে, মানুষকে চরিত্র গঠন শিক্ষাদানের জন্য এ আদেশ দেওয়া হয়েছে যে, আমার নিয়ামতসমূহ যে সকল মাধ্যম অতিক্রম করে আসে, সেগুলোরও শুকরিয়া আদায় করতে হবে। আর যে ব্যক্তি ইহসানকারীর শোকার আদায় করে না, সে বাস্তবপক্ষে আল্লাহ তা’আলারও শোকর করে না।
কোনো মানুষের জন্যই নিজের প্রশংসা জায়েজ নয়: কোনো মানুষের জন্য নিজের প্রশংসাক রা জায়েজ নয়। কুরআনে ইরশাদ হয়েছেÑ
فَلَا تُزَكُّوا أَنْفُسَكُمْ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَى
অর্থাৎ তোমরা আত্মা-প্রশংসা বা পবিত্রতার দাবি করো না, আল্লাহই ভাল জানেন, কে মুত্তাকী। (নাজম:৩২)। কেননা, মানুষের পক্ষে প্রশংসার যোগ্য হওয়া তার তাকওয়া-পরহেযগারীর উপর নির্ভরশীল। কার পরহেযগারী কোন স্তরের তা আল্লাহই ভাল জানেন। প্রশ্ন ওঠে যে, আল্লাহ তা’আলা তো তাঁর প্রশংসা নিজেই করেছেন। উত্তর হচ্ছে এই, আল্লাহর প্রশংসা বা তা’রীফ কিভাবে করতে হবে সে পদ্ধতি উদ্ভাবন করার যোগ্যতা মানুষের নেই। পরন্তু আল্লাহ তা’আলার উপযোগী প্রশংসা করাও মানুষের ক্ষমতার উর্ধ্বে। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন- لااحصى ثناءعليك আমি আপনার উপযোগী প্রশংসা করতে পারি না। এজন্যই আল্লাহ তা’আলা তাঁর প্রশংসার পদ্ধতি মানুষকে নিজের পক্ষ থেকে শিক্ষা দিয়েছেন।
‘রব’ আল্লাহর এক বিশেষ নাম, অন্য কাউকে এ নামে সম্বোধন জায়েজ নয়: কোনো বস্তুর মালিক, পালনকর্তা এবং সর্ববিষয়ে সে বস্তুর পূর্ণতা বিধানের একচ্ছত্র অধিকারী কোনো সত্তার প্রতিই কেবল ‘রব’ শব্দ প্রয়োগ করা যেতে পারে। আর এ কথা সর্বজন বিদিত যে, সমগ্র সৃষ্টি জগতের এরূপ মালিক ও পালনকর্তা একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া অন্য কেউ হতে পারে না। এ কারণেই এ শব্দ একমাত্র আল্লাহ তা’আলার নামের সাথেই ব্যবহৃত হতে পারে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ‘রব’ বলা জায়েজ নয়। সহীহ মুসলিম শরীফের হাদীসে এ ব্যাপারে নিষেধবাণী উচ্চারণ করে বলা হয়েছে যে, কোনো গোলাম বা কর্মচারী যেন তার মালিককে ‘রব’ শব্দ দ্বারা সম্বোধন না করে। অবশ্য বিশেষ কোনো বস্তুর মালিকানা বুঝানোর অর্থে এ শব্দের প্রয়োগ হতে পারে। যথা- রাব্বুল-বাইত, (বাড়ির মালিক) ইত্যাদি।
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ মুফাসসিরকুলকুল-লিরোমণি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এর অর্থ বলেছেন, আমরা তোমারই ইবাদত করি, তুমি ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করি না। আর তোমারই সাহায্য চাই, তুমি ব্যতীত অন্য কারো সাহায্য চাই না। (ইবনে জারীর, ইবনে আবী হাতেম)
সলফে-সালেহীনদের কেউ কেউ বলেছেন যে, সূরা আল-ফাতিহা সমগ্র কুরআনের সারমর্ম এবং إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ সমগ্র সূরা আল-ফাতিহার সারমর্ম। কেননা, এর প্রথম বাক্যে রয়েছে শিরক থেকে মুক্তির ঘোষণা এবং দ্বিতীয় বাখ্যে তাঁর পরিপূর্ণ শক্তি ও কুদরতের স্বীকৃতি। মানুষ দুর্বল, আল্লাহর সহায্য ব্যতীত কোনো কিছুউ সে করতে পারে না। তাই সকল ব্যাপারে আল্লাহর উপর একান্তভাবে নির্ভর করা ব্যতীত তার গত্যন্তর নেই। এ উপদেশ কুরআনের স্থানে স্থানে দেওয়া হয়েছে। যথা- فَاعْبُدْهُ وَتَوَكَّلْ عَلَيْهِ
অর্থাৎ তুমি তারই উপাসনা কর এবং তারই উপর ভরসা কর।
قُلْ هُوَ الرَّحْمَنُ آمَنَّا بِهِ وَعَلَيْهِ تَوَكَّلْنَا
অর্থাৎ তুিম বল! তিনিই দয়াময় প্রভু; আমার তাঁর উপর ঈমান এনেছি এবং তরই উপর ভরসা রাখি (মুয্যাম্মিল৯)
رَبُّ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ فَاتَّخِذْهُ وَكِيلًا
অর্থাৎ পূর্ব ও পশ্চিমের প্রভূ! তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, কাজেই তাঁকেই অীভভাবকরূপে গ্রহণ কর।
এআয়াতগুলোর সারমর্ম হচ্ছে যে, মু’মিন স্বীয় আমল বা নিজের যোগ্যতার উপর নির্ভর করে না, আবার অন্য কারো সাহায্যের উপরও নয়; বরং একমাত্র আল্লাহর সাহায্যের উপরই তাকে পূর্ণ ভরসা করতে হবে। এতে আকায়েদের দু’টি মাসআলারও মীমাংসা হয়ে গেছে। যথা
১. আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত জায়েজ নয়। তাঁর ইবাদতে অন্য কাউকে অংশীদার করা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। ইত:পূর্বে ইবাদতের পরিচয় দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে যে, কোনো সত্তার অসীমতা, মহত্ত্ব এবং তাঁর প্রতি ভালবাসার ভিত্তিতে, তাঁর সামনে অশেষ কাকুতিমিনতি পেশ করার নামই ইবাদত। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো সাথে অনুরূপ আচরণ করাই শিরক। এতে বুঝা যাচ্ছে যে, মূর্তিপূজার মতো প্রতীকপূজা বা পাথরের মূর্তিকে খোদায়ী শক্তির আধার মনে করা বা কারো প্রতি ভালবাসা এ পর্যায়ে পৌছে দেওয়া, যা আল্লাহর জন্য করা হয়, তাও শিরকের অন্তর্ভূক্ত। কুরআনে ইহুদি ও নাসারাদের অনুসৃত শিরকের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছেÑ
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ
অর্থাৎ তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের সাধু সন্ন্যাসীদেরকে প্রভু বানিয়েছে। (তাওবা:৩১) আদী ইবনে হাতেম খ্রিষ্টধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হবার পর এ আয়াত সম্বন্ধে রাসূল (সা.) কে প্রশ্ন করেছিলেন যে, আমরা তো আমাদের পুরোহিতদের ইবাদত করিনি, কুরআন আমাদের প্রতি কিভাবে এ অপবাদ দিয়েছে? প্রত্যুত্তরে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছিলেনÑ “পুরোহিত আলেমগণ এমন অনেক বস্তুকে কি হারাম বলেনি, যেগুলোকে আল্লাহ হালাল করেছেন এবং এমন অনেক বস্তুকে হালাল বলেনি, যেগুলোকে আল্লাহ হারাম বলেছেন? আদী ইবনে হাতেম স্বীকার করেছিলেন যে, তা অবশ্য করেছেন। তখন রাসূল (সা.) বলেছিলৈন যে, এ তো প্রকারান্তরে তাদের ইবাদতই হলো।”
এতে বুঝা যায় যে, কোনো বস্তুকে হালাল বা হারাম ঘোষণা করা একমাত্র আল্লাহরই কাজ। যে ব্যক্তি এ কাজে অন্যকে অংশীদার করে হালাল ও হারাম জানা থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো কথাকে অবশ্যকরণীয় মনে করে, তাবে প্রকারান্তরে সে তার ইবাদতই করে এবং শিরকে পতিত হয়। সাধারণ মুসলমান যারা কুরআন-হাদীস সরাসরি বুঝতে পার না, শরিয়তের হুকুম-আহকাম নির্ধারণের যোগ্যতা রাখে না; এ জন্য কোনো ইমাম, মুজতহিদ, আলেম বা মুফতির কথার উপর বিশ্বাস রেখে কাজ করে; তাদের সাথে এ আয়াতের মর্মের কোনো সম্পর্ক নেই; কেননা, প্রকৃতপক্ষে তারা কুরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক আমল করে; আল্লাহর নিয়ম-বিধানেই অনুকরণ করে। আলেমগণের নিকট থেকৈ তারা আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহর ব্যখ্যা গ্রহণ করে মাত্র। কুরআনই তাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেÑ
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
অর্থাৎ “যদি আল্লাহর আদেশ তোমাদের জানা না থঅকে, তবে আলেমদের নিকট জেনে নাও।” (রাহল:৩৪)
হালাল-হারাম নির্ধারণের ব্যাপারে আল্লাহ ব্যতীত অন্য যে কাউকেই অংশীদার করা শিরক। অনুরূপবাবে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে মানত করাও শিরক। প্রয়োজন মেটানো বা বিপদ মুক্তির জন্য আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো কাছে দোয়া করাও শিরক। কেননা, হাদীসে দোয়অকে ইবাদতরূপে গণ্য করা হয়েছে। কাজেই যে সকল কার্যকলাপে শিরকের নিদর্শন রয়েছে, সেসব কাজ করাও শিরকের অন্তর্ভুক্ত। হযরত আদী ইবনে হাতেম বলেন, ইসলাম কবুল করার পর আমি আমার গলায় ক্রস পরিহিত অবস্থায় রাসূল (সা.) এর দরবারে উপস্থিত হয়েছিলাম। এটা দেখে হুযূর (সা.) আদেশ করলেন, এ মূর্তিটা গলা হতে ফেলে দাও। আদী ইবনে হাতেম যদিও ক্রস সম্পর্কে তখন নাসারাদের ধারণা পোষণ করতেন না, এতদসত্ত্বেও প্রকাশ্যভাবে শিরকের নিদর্শন থেকৈ বেঁচে থাকা অত্যাবশ্যকীয় বলে রাসূল (সা.) তাঁকে এ নির্দেশ দিয়েছিলেন।
আফসোসের বিষয়! আজকাল হাজার হাজার মুসলমান খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় নিদর্শন ক্রস-এর বিকল্প নেকটাই সগৌরবে গলায় লাগিয়ে প্রকাশ্য শিরকীতে লিপ্ত হচ্ছে। এমনিভাবে কারো প্রতি রুকু বা সেজদা করা, বায়তুল।লাহ ব্যতীত অন্য কোনো কিছুর তওয়াফ করা শিরকের অন্তর্ভূক্ত। এসব থেকৈ বেঁচে থাকার স্বীকারোক্তি এবং আনুগত্যের অঙ্গীকারই إِيَّاكَ نَعْبُدُ তে করাহ য়েছে।
দ্বিতীয় মাস’আলা: কারো সাহায্য চাওয়ার বিষয়টি কিছুটা বিস্তারিত আলোচনা সাপেক্ষ! কেননা, বৈষয়িক সাহায্য তো একজন অপরজনের কাছ থেকৈ সব সময়ই নিয়ে থাকে। এছাড়া দুনিয়ার সকল শ্রেণীর কারিগরই অন্যের সাহায্যে নিয়োজিত, অন্যের খেদমতে সর্বদা ব্যস্ত এবং প্রত্যেকেই তাদরে সাহায্যপ্রার্থী ও সাহায্য গ্রহণে বাধ্য। এরূপ সাহায্য নেওয়া কোনো ধর্মমতেই বা কোনো শরিয়তেই নিষেধ নয়। কারণ, এ সাহায্যের সাথে আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রার্থিত সাহায্য কোনো অবস্থাতেই সম্পৃক্ত নয়, অনুরূপবাবে কোনো নবী বা ওলীর বরাত েিদযও আল্লাহ তা’আলার সাহায্য প্রার্থনা করা কুরআনের নির্দেশ ও হাদীসের বর্ণনায় বৈধ প্রমাণিত হয়েছে। এরূপ সাহায্য প্রার্থনাও আল্লাহর সম্পর্কযুক্ত করা হয়েছে।
আল্লাহর নিকট বিশেষাববে প্রার্থিত সাহায্য দু’প্রকার। এক-আল্লাহ ব্যতীত কোনো ফেরেশতা, কোনো নবী, কোনো ওলী বা কোনো মানুষকে একক ক্ষমতাশীল বা একক ইচ্ছাশক্তির অধিকারী মনে করে তাদের নিকট কিছু পাওয়অ এটা ডপ্রকাশ্য কুফরি। এক কাফের-মুশরিকরাও কুফরি বলে মনে করে। তারা নিজেদের দেবীদেরও আল্লাহর ন্যায় সর্বশক্তিমান একক ইচ্ছাশক্তির অধিকারী মনে করে না।
দুই-সাহায্য প্রার্থনার যে পন্থা কাফেরগণ গ্রহণ করে থাকে, কুরআন তাকে বাতিল ও শিরক বলে ঘোষণা করেছে। তাহচ্ছে কোনো ফেরেশতা, নবী, ওলী বা দেবদেবী সম্পর্কে এমন ধারণা পোষণ করা যে, প্রকৃত শক্তি ও ইচ্ছার মালিক তো আল্লাহ তা’আলাই, তবে তিনি তাঁর কুদরতে সে ক্ষমতা ও ইচ্ছাশক্তির কিছু অংশ অমুককে দিয়েছেন এবং এ ব্যাপারে তাকে ক্ষমতা দান করেছেন এবং সেক্ষমতা প্রয়োগের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সম্পূর্ণ স্বাধীন। কুরআনের إِيَّاكَ نَسْتَعِينُ দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, এরূপ সাহায্য আমরা আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত অন্য কারো নিকট চাইতে পারি না।
সাহায্য-সহায়তা সম্পর্কিত এ ধারণা মু’মিন ও কাফের এবং ইসলাম ও কুফরির মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করে। কুরআন একে হারাম ও শিরক ঘোষণাকরেছে এবংকাফেরগণ একে সমর্থন করে এ অনুযায়ী আমল করছে। এ ব্যাপারে যেখানে সংশয়ের উদ্ভব হয় তা হচ্ছে- আল্লাহ তাঁর কোনো কোনো ফেরেশতার উপর পার্থিব ব্যবস্থা পরিচালনার অনেক দায়িত্ব অর্পণ করেছেন বলে বর্ণনা রয়েছ্ েএরূপ ধারণা সৃষ্টি হওয়া বিচিত্র নয় যে, ফেরেশতাগণকে স্ব-স্ব দায়িত্ব পালনে আল্লাহ নিজেই তা ক্ষমতা দিয়েছেন, তদনুরূপ নবীগণকেওে এমন কিছু কাজ করার ক্ষমতা দিয়েছেন যা অন্য মানুষেল ক্ষমাতার উধ্বে; যথা, মুজিযা। অনুরূপ আওলিয়াগণকেও এমন কিছু কাজের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা সাধারণ মানুষ করতে পারে না। যেমন, কারাম। সুতরাং স্বল্পবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষে এরূপ ধারণায় পতিত হওয়া বিচিত্র নয় যে, আল্লাহ তা’আলা স্বীয় ক্ষমতার কিয়দাংশ যদি তাঁদের মদ্যে না-ই দিতেন তবে তাঁদের দ্বারা এমন সব কাজ কি করে হয়ে থাকে? এত নবী ও ওলীগণের প্রতি কর্মে স্বাধীন হওয়ার বিশ্বাস জন্মে। কিন্তু বাস্তবে তা নয়; বরং মু’জিযা এবং কারামত একমাত্র আল।রাহরই কাজ। এর প্রকাশ নবী ও ওলীগণের মাধ্যমে করে থাকেন শুধু তাঁর হেকমত ও রহস্য বুঝাবার জন্য। নবী ও ওলীগণের পক্ষে সরাসরি এসব কাজ করার ক্ষমাতা নেই। এ সম্পর্কে অসংখ্য আয়াতে রয়েছে। যথা, ইরশাদ হয়েছেÑ
وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ رَمَى (سورة النفال:১৮)
বদরের যুদ্ধে রাসূল (সা.) শত্রু সৈন্যদের প্রতিা একমুষ্টি কঙ্কর নিক্ষেপকরেছিলেন এবং সে কঙ্কর শত্রু সৈন্যের চোখে গিয়ে পড়েছিল। সে মু’জিযা সম্পর্কে এ আয়াতের বলা হয়েছে যে, “হে মুহাম্মদ এতে বোঝা যায় যে, নবীগণের মাধ্যমে মু’জিযারূপে যেসব অস্বাভাবিক কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে সেগুলো ছিল আল্লাহরই কাঝ। অনুরূপ, হযরত নূহ(আ.) কে তাঁর জাতি বলেছিল যে, আপনি যদি সত্য নবীহয়ে থাকেন, তবে যে শাস্তি সম্পর্কে আমাদের ভীতি প্রদর্শন করেছেন, তা এনে দেখান। তখন তিনি বলেছিলেন, إِنَّمَا يَأْتِيكُمْ بِهِ اللَّهُ মু’জিযারূপে আসমানী বালা নিয়ে আসা আমার ক।ষমতার উধ্বে। যদি আল্লাহ ইচ্ছা করেন তবে আসবে, তখন তোমরা তা থেকে পালাতে পারবে না।
সূরা ইবরাহীমে নবী ও রাসূলগণের এক দলের কথা উল্লিখিত হয়েছে। তাঁরা বলেনেÑ
مَا كَانَ لَنَا أَنْ نَأْتِيَكُمْ بِسُلْطَانٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ
অর্থাৎ কোনো মু’জিযা দেখানো আমাদের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে না। আল্লাহর ইচ্ছা ব্রতীত কিছুই হতে পারে না।” (ইবরাহীম:১১) তাই কোনো নবী বা ওলী কোনো মু’জিযা বা কারামত যখন ইচ্ছা বা যা ইচ্ছা দেখঅবেন, এমন ক্ষমতা তাদের কাউকেই দেওয়া হয়নি।
রাসূল ও নবীগণকে মুশরিকরা কত রকমের মু’জিযা দেখাতে বলেছে, কিন্তু যেগুলোতে আল্লাহর ই্চ্ছা হয়েছে সেগুলোই প্রকাশ পেয়েছে। আর যেগুলোতে আল্লাহর ইচ্ছা হয়নি, সেগুলো প্রকাশ পায়নি। কুরআনের সর্বত্র এ সম্পর্কিত তথ্য বিদ্যমান।
একটি স্থুল উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি উপলব্ধি করা সহজ হবে। যেমন, ঘরে বসে আমরা যে বাল্বের আলো ও বৈদ্যুতিক পাখার বাতাস পাই, সে বালব ও পাখা এই আলো ও হাওয়া প্রদানের বিদ্যুৎ-কেন্দ্রের সাথে এগুলোর যে সম্পর্ক স্থাপিত, আলো এবং বাতাস প্রতদান একান্তভাবে সে সংযোগের উপরই নির্ভরশীল। এক মুহূর্তের জন্যও যদি এ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয় তবে না বাল্ব আপনাকে আলো দিতে পারবে, না পাখা বাতাস দিতে সক্ষম হবে। কেননা, এ আলো বাল্বের নয়; বরং বিদ্যুতের, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন-কেন্দ্রে হতে বাল্ব ও পাখার মধ্যে পৌঁছে থাকে। নবী, রাসূল, আওলিয়অ ও ফেরেশতাগণ প্রত্যেকেই প্রতিটি কাজের জন্য প্রতি মুহূর্তে আল্লাহ তা’আলার মুখঅপেক্ষী। তাঁর ইচ্ছায়ই বাল্ব ও পাখার মধ্যে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের ন্যায় নবী ও আওলিয়াগণের মাধ্যমে মু’জিযা ও কারামতরূপে আল্লাহর ইচ্ছা প্রতিফলিত হয়।
এ উদাহরণে এ কথাও বুঝা গেল যে, মু’জিযা ও কারামত প্রতিফলনে নবী-রাসূল ও ওলীগণের কোনো একচ্ছত্র ক্ষমতা নেই। তবে তাঁরা যে একেবারেই ক্ষমতাহীন তাও নয়। যেমনিভাবে বাল্বও পাখা ব্যতীত আলো ও বাতাস পাওয়া অসম্ভব, তেমনিভাবে মু’জিযা ও কারামত প্রকাশের ব্যাপারে নবী ও ওলীগণের মাধ্যমের প্রয়োজন হয়। পার্থক্য শুধু এইটুকু যে, সম্স্ত ফিটিং সংযোজন ঠিক হওয়া সত্ত্বেও বালব এবং পাখা ব্যতীত আলো-বাতাস পাওয়া অসম্ভব, কিন্তু মু’জিযা ও কারামতের ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা সব কিছুই করতে পারেন। তবে সাধারণত তিনি নবী-রাসূল ও ওলীগণের মাধ্যম ব্যতীত তা করেন না। কারণ, তাতে এগুলোর প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হতে পারে না।
তই এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, সব কিছুই একমাত্র আল।লাহ তা’আলার ই্চছাতেই হয়ে থাকে এবং এতদসঙ্গে নবী-রাসূল ও ওলী-আওলিয়াগনের গুরুত্বের বিশেষভাবে স্বীকৃতি প্রদান করতে হবে। এ বিশ্বাস এবং স্বীকৃতি ব্যতীত আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাঁর ভিধানের অনুসরণ থেকে বঞ্চিত হতে হবে। যেভাবে কোনো ব্যক্তি বাল্ব ও পাখার গুরুত্ব অনুধাবন না করে একে নষ্ট করে দিয়ে আলো-বাতাস পাওয়ার আশা করতে পারে না, তেমনি নবী-রাসূল ও ওলী-আওলিয়াগণের গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্যের স্বীকৃতি ব্যতীত আল্লাহর সন্তুষ্টি আশা করা যায় না।
সাহায্য প্রার্থনা ও অসিলা তালাশ করা এবং তা গ্রহণ করা প্রশ্নে নানা প্রকার প্রশ্ন ও সংশয়ের উৎপত্তি হতে দেয়খা যায়। আশা করা যায় যে, ্পরিউক্ত আলোচনা দ্বারা সে সংশয় ও সন্দেহের নিরসন হবে।
নবীÑরাসূল এবং ওলীগণকে অসিলা বানানো সম্পূর্ণ জায়েজ বা একেবারেই নাজায়েজ বলা সঙ্গত নয়; বরং উপরের আলোচনার ভিত্তিতে এতটুকু বলা যায় যে, যদি কেউ তাঁদেরকে বাস্তব ক্ষমতাবান, ্সবীয় শক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্র্ণ এবং হাজত পূরণের অধিকারী মনে করে, তবে তা হারাম এবং শিরক হবে। কিন্তু যদি তাদেরকে আল্লাহর সন্তুষ্টি আহরণের মাধ্যম জ্ঞাণ করে তাঁদের অসিলা গ্রহণ করা হয়, তবে এটা সম্পূর্ণ বৈধ হবে। কিন্তু এ প্রশ্নে সাধঅরণত বাড়াবাড়ি করতে দেখঅ যয়।
সিরাতে-মুস্তাকীমের হিদায়েতই দীন-দুনিয়ার সাফল্যের চাবিকঠি: আলোচ্য তাফসীরে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে যে, আল্লাহ তা’আলা যে দোয়াকে সর্বক্ষণ সকল লোকের সকল কাজের জন্য নির্ধারণ করেছেন তা হচ্ছে সিরাতুল-মুস্তাকীমের হিদায়েতপ্রাপ্তির দোয়া। এমনিভাবে আখেরাতের মুক্তি যেমন সে সরল পথে রয়েছে যা মানুষকে জান্নাতে নিয়ে যাবে, অনুরূপভাবে দুনিয়ার যাবতীয় কাজের উন্নতি-অগ্রগতিও সিরাতুল-মুস্তাকীম বা সরল পথের মধ্যে নিহিত। যে সমস্ত পন্থা অবলম্বন করলে উদ্দেশ্য সফল হয়, তাতে পূর্ণ সফলতাও অনিবার্যভাবেই হয়ে থাকে।
والله اسال الصواب والسداد وبيده المبدا والمعاد.
যেসব কাজে মানুষ সফলতা লাভ করতে পারে না, তাতে ঘভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝা যায় যে, সে কাজের ব্যবস্থা পনা ও পদ্ধতিতে নিশ্চয়ই কোনো ভুল হয়েছে।
সারকথা, সরল পথের হিদায়েত কেবল পরকাল বা দীনি জীবনের সাফল্যের জন্যই নির্দিষ্ট নয়; বরং দুনিয়ার সকল কাজের সফলতাও এরই উপর নির্ভরশীল। এ জন্যই প্রত্যেক মু’মিনেরএ দোয়া তাসবীহস্বরূপ সর্বদা স্বরণ রাখা কর্তব্য। তবে মনোযোগ সহকারে স্মরণ রাখতে ও দোয়া করতে হবে; শুধু শব্দের উচ্চারণই যথেষ্ট নয়।
والله الموفق ونعم المعين.

Leave a Reply